১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দৃষ্টিপাতই সকল অনর্থের মূল

মাওলানা দৌলত আলী খান

চোখের দৃষ্টি মহান আল্লাহর মহা নেয়ামত। এ দৃষ্টি দ্বারাাই মানুষের পথ চলা ও জীবন গড়া। এর উপর মানবজাতির সভ্যতা ও অসভ্যতা নির্ভর করে। চক্ষুসত্তাই সিদ্ধান্ত দিবে পরকালের জান্নাত ও জাহান্নামের। যে চোখ দুনিয়াতে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে দেখেছে তার পরকালিন পুরস্কার হবে জান্নাত। আর যে চোখ অপরাধকে অপরাধ হিসেবে দেখে নাই তার পরকালিন শাস্তি হবে জাহান্নামের অগ্নিশিখা। মুসলিম উম্মাহর চোখের প্রত্যেক দৃষ্টি ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে- যদি শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় চোখের দৃষ্টিশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কোরআন ও হাদিসে দৃষ্টিকে সংযত রাখার জন্য একাধিকবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, কুদৃষ্টিই হচ্ছে সমস্ত অনর্থের মূল। যতোসব অশ্লীলতার উৎস। ইসলাম দৃষ্টিকে চোখের যেনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। অভিজ্ঞতার জগতেও তা সর্বজন স্বীকৃত। সুতরাং দৃষ্টিকে অপরাধ জগত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ইসলামের বিধি-নিষেধ মেনে চলা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব ও ঈমানদারির পরিচয়।
কোরআনে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ : দৃষ্টি সংযত রাখা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অভিপ্রায়। এটিই আল্লাহ তায়ালার নিকট ইবাদত হিসেবে গণ্য। কারণ, দৃষ্টিই হচ্ছে সমস্ত ফেতনা-ফাসাদের মূল। তাই ইসলাম এ ছিদ্রপথটি সবার্গ্রে বন্ধ করেছে। কুদৃষ্টি থেকেই বান্দার অন্তরে কুবাসনার জন্ম হয়। আর এ কুবাসনাই মানব জাতিকে অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত করে। তাই দৃষ্টি সংযত রাখতে মহা গ্রন্থ আল কোরআনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, (হে নবী!) মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এটিই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে, আল্লাহ সে বিষয়ে অবগত। (সূরা নুর : ৩০)
তিনি আরও বলেন, (হে নবী!) মুমিনদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে আনত করে ও তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। সাধারণত যা প্রকাশ থাকে, তা ব্যতীত সৌন্দর্য্য প্রদর্শন না করে। (সূরা নুর : ৩১)
হাদিসে দৃষ্টি আনত করার তাকিদ : শয়তানের বিষমাখা তীরসমূহের মধ্যে দৃষ্টিও একটি তীর। এ তীর নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের জন্য খুবই কঠিন কাজ। কারণ, এতে প্রবৃত্তির লালসাই কার্যকরি ভূমিকা রাখে। এ কারণে রাসুল (সা.) চোখের দৃষ্টিকে আনত করার জন্য উম্মতের উপর বিশেষভাবে তাকিদ করেছেন। যাতে দৃষ্টি আনত করার মাধ্যমে দেশ ও জাতির শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। ফিতনা-ফাসাদ ও অশ্লীলতা থেকে মুসলিম জাতি মুক্তি পাই। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আলীকে বললেন, হে আলী! হঠাৎ একবার দেখার পর পুনরায় কোনো বেগানা মহিলাকে দেখো না। কেননা, তোমার জন্য প্রথমবারের অনুমতি রয়েছে যখন তা অনিচ্ছায় বা ঘটনাক্রমে হয়ে যাবে। দ্বিতীয়বারের অনুমতি নেই। (আবু দাউদ : ২১৫১; তিরমিজি : ৩০০৪)
দৃষ্টি সংযত রাখার পুরস্কার : আল্লাহ তায়ালা যেসব জিনিসকে হেফাজত করার নির্দেশ করেছেন তন্মধ্যে দৃষ্টিপাত সংরক্ষণ করাও অন্তর্ভুক্ত। এ দৃষ্টিপাতকে অবৈধভাবে ব্যবহার করা থেকে হেফাজত করতে হবে। যৌনের পবিত্রতা রক্ষার একমাত্র উপায় হচ্ছে স্বীয় দৃষ্টিকে হেফাজত করা। যে ব্যক্তি দৃষ্টিকে হেফাজত করবে তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে কোনো মুসলমান কোনো স্ত্রী লোকের সৌন্দর্যের প্রতি যদি হঠাৎ প্রথমবার দৃষ্টি পড়ে যায়। অতঃপর সে আপন চক্ষু বন্ধ করে নেয়, তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার জন্য এক ইবাদতের সুযোগ সৃষ্টি করেন, যাতে সে এর স্বাদ পায়। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালনের জন্য অন্তরে এক পরম তৃপ্তি লাভ করবে। আর এই তৃপ্তি ওই কষ্টের বিনিময়ে যা ছবরের কারণে হয়। (মেশকাত : ২৯৯০) দৃষ্টি সংযত না রাখার পরিণাম : দৃষ্টি হেফাজত মূলত গুপ্তাঙ্গ ও যৌনাঙ্গের সংরক্ষণ। যে দৃষ্টির লাগাম ছেড়ে দিলো, সে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দিলো। দৃষ্টিপাতই সব ক্ষতির মূল। কেননা, দৃষ্টি দেহে শিহরণ সৃষ্টি করে। দৃষ্টিকে হেফাজত না করার কারণে দুনিয়া ও আখেরাতে লাঞ্ছনা ও শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, চোখের ব্যভিচার হলো চোখ দিয়ে দেখা, কানের ব্যভিচার হলো কান দ্বারা শুনা, জিহবার ব্যভিচার কথা বলা, হাতের ব্যভিচার হাত দ্বারা স্পর্শ করা, পায়ের ব্যভিচার পথ চলা এবং মনের ব্যভিচার কামনা-বাসনা করা। আর যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। (মুসলিম : ৬৯২৫) রাসুল আরও বলেন, মহান আল্লাহ অভিশম্পাত করেন ইচ্ছাকৃত দৃষ্টিকারী এবং ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টিতে পতিত হয় তার প্রতি।
(মেশকাত : ২৯৯১)
লেখক : শিক্ষক, নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা,

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?