পাহাড়ি টিলায় উচু-নিচু সারি সারি সবুজ চা বাগান। মেয়েরা মাথায় জুড়ি বেধে চা তোলে। চির চারিত নিয়মে মহিলা চা শ্রমিকদের সবুজ চা সংগ্রহের মনোরম দৃশ্য আর তাদের ঘাম জড়ানো কষ্ট আগন্তুকের হৃদয় ব্যাকুল করে তোলে…..।
সারি সারি রাবার বাগান। লাল মাটির পেয়লায় সাদা কষে ভরা। রাবার কষ সংগ্রহকারী শ্রমিকের কঠিন কষ্টের দৃশ্য। পাখির কলতান। লাল মাটির সবুজ পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা পথ যত গভীর জঙ্গলে যাই আরো যেতে ইচ্ছে করে……..। সবুজ নৈসর্ঘ্যে হারিয়ে যেতে মন চায়। এমনি চিত্র চোখে পড়বে ফটিকছড়ির ১৮টি চা বাগান, ৪টি রাবার বাগান ও বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রমে বেড়াতে গেলে। তাই ভ্রমন পিপাসুরা ছুটে আসতে পারেন ফটিকছড়িতে।
বৃটিশের চা ও রাবার শিল্প:

প্রায় ২শত বছর পূর্বে বৃটিশ শাষনকালে সৌখিন বৃটিশরা এদেশে চা শিল্প গড়ে তোলে। সেই সুবাধে পাহাড় ব্যষ্টিত বৃহত্তর ফটিকছড়িতে এশিয়ার বৃহত্তম কর্ণফুলী চা বাগান সহ ১৮টি চা বাগান গড়ে উঠেছে। এই চা বাগানকে কেন্দ্র উত্তর চট্টগ্রামের বৃহত্তর বানিজ্য কেন্দ্র নাজিরহাট পর্যন্ত রেল লাইন গড়ে ঊঠেছিল। জাতীয় অর্থনীতিতে ভুমিকা রাখছে ফটিকছড়ির ১৮টি চা বাগান। চট্টগ্রাম ভ্যালীর শুধূ একটি উপজেলাতেই ১৮টি চা বাগান শুনতেই অবিশ্বাস্য লাগে। বাগান গুলো দেশের শীর্ষ স্থানীয় চা বাগান হিসেবে কয়েক দশক থেকে স্থান দখল করে আছে। ফটিকছড়ির মোট ভুমির প্রায় ৩০% এলাকা জুড়ে রয়েছে চা বাগান গুলো। এসব বাগান থেকে শতকে ৫টাকা হারে ভুমি উন্নয়নকর পায় রাজস্ব বিভাগ। বর্তমানে এসব চা বাগানে প্রায় শ্রমিক সংখ্যা ১৫ হাজার জন। তাদের দৈনিক বেতন ১৭৫ টাকা। চা শ্রমিক পাড়ার জন সংখ্যা প্রায় অর্ধ লক্ষ জন। চা কর্মচারী-কর্মকর্তা রয়েছে প্রায় সাড়ে ৬শ জন। চলতি বছর প্রায় ১ কোটি কেজি চা উৎপাদন করেছে বাগান গুলো। সেখানে চা নিলাম কেন্দ্রে কেজি প্রতি ১৫ টাকা হারে রাজস্ব পায় সরকার। এ যাবৎ কালের সর্বোচ্চ চা নিলাম কেন্দ্রের রেকর্ডও রয়েছে ফটিকছড়ির বাগান গুলোতে। চা বাগানের জলাশয় গুলোতে শত কোটি টাকার মাচ চাষ হয়। পতিত জমি গুলোতে চা শ্রমিকরা ধান চাষও করে। এশিয়ার বৃহত্তম দাতমারা রাবার বাগানসহ ৪টি রাবার গড়ে উঠেছে। বিশ্ব বানিজ্যের কারণে বাংলাদেশের কাচা রাবার শিল্পের যায়যায় অবস্থা। তবে প্রচুর রাবার অবৈধ পথে পাশবর্তী দেশ ভারতে পাচার হয় বলে প্রচুর জনশ্রুতি রয়েছে। অপর দিকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেষে আরেক অপরূপ দর্শণীয় স্থান রামগড় চা বাগান। এই বাগানের চতুরদিকে পাহাড়ি বনাঞ্চল, ঢাকা-খাগড়াছড়ি মহা সড়ক ও ভারতীয় সীমান্ত হওয়াই বাগানের অপরূপ মনোরম দৃশ্য পথিকের মন সহজেই কেড়ে নেয়। ছোট-ছোট খাল-ছড়া চা-রাবার বাগান, গাড়িটানা-ভূজপুন-নাজিরহাট সড়ক ও ভূজপুর হালদা রাবার ড্যাম আকর্ষনীয় করে ভ্রমন পিপাসুদের।
বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রনে পরিচালিত চারটি রাবার বাগান ফটিকছড়িতে। এশিয়ার সর্ববৃহত রাবার বাগার দাঁতমারা রাবার বাগান, তারাখোঁ রাবার বাগান, রাঙ্গামাটিয়া রাবার বাগান, কাঞ্চন নগর রাবার বাগান।
ঢাকা-খাগড়াছড়ি সড়ক ঘেষে দাঁতমারা রাবার বাগান, গহিরা-হেয়াকো সড়ক ঘেষে তারাখো রাবার বাগান, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক ঘেষে কাঞ্চন নগর ও রাঙ্গামাটিয়া রাবার বাগান অবস্থিত হওয়ায় ভ্রমন পিপাসুদের নজর সহজেই কাড়ে। এসব দেখতে প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী এখানে ভিড় করে। ফটিকছড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নিয়ে একটি টুরিষ্ট জোন হতে পারে। হতে পারে সেটি কোন কর্পোরেট হাউস কেন্দ্রিক। নয় তো ফটিকছড়ির একদল উদ্যোমী তরুন সমাজ।
হাজারীখীল বন্যপ্রানী অভয়ারনণ্য:

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাজারীখিল রেঞ্জের হাজারী খিল ও ফটিকছড়ি বিট এলাকায় বন বিভাগ ও ক্রেল’র সহযোগিতায় ২০১০ সালে ২ হাজার ৯ শত ৮ হেক্টর পাহাড়ী অঞ্চলে সরকরী ভাবে গড়ে উঠছে বন্যপ্রাণী অভায়রণ্য। এখানে ২শত ৫০ প্রজাতির গাছ ও ১ শত ৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে বলে বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছে। বাংলাদশেরে বিরল প্রজাতির বৈলাম গাছ রয়েছে এই বনে। যার উচ্চতা হলো প্রায় ১০০ মিটার যা বাংলাদেশে সবচেয়ে উচু বৃক্ষ হিসেবে পরিচিতি। এই গাছ বাংলাদেশরে অন্য কোথাও দেখা যায় না । আর বন্য প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ”বন ছাগল” নামক বিরল প্রজাতীর আরেক প্রাণী। যা এই অঞ্চলে অভয়ারন্য ঘোষনার পর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে বনকর্তারা। এ ছাড়া হাজারীখীল বনে বনকুকুর, বনমুরগী, তক্ষক, গরিগীটি, মুখপোড়া হনুমান, বানর, গুইসাপ, বড় অজগর, হরিণ, মেছোবাঘ, বন্যশূকর রয়েছে প্রচুর। উল্লেখ যোগ্য বৃক্ষ হল সেগুন, র্গজন, গামারী, চাপালশি, তলেসুর, জারুল, লোহাকাঠ, ছাতীয়ান, গুটগুট্টা, লটকন। পাখরি মধ্যে রয়েছে মথুরা, শালিক, ঘুঘু, চড়ুই, টিয়া, বক, দোয়েল, ময়না রয়েছে বলেও জানান। প্রাকৃতকি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র রক্ষার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদশে সরকাররে বন, পরবিশে ও মৎস্য অধিদপ্তররে যৌথ উদ্যোগে ইউএসএইডের আর্থিক সহযোগতিায় ২৭ নভম্বের ২০১৪ সালে হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) গঠন করা হয়। দুইটি বনবিটে ২১ সদস্য বিশিষ্ট মোট ৪২ জন সিপিজি সদস্য সর্বদা বন রক্ষায় কাজ করছে।
মাইজভান্ডার দরবার শরীফ:

দেখে যারে মাইজভান্ডারে হইতেছে নুরের খেলা…….. গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী ইসকুল খুলেছে…………. এমনি অনেকে মাইজভান্ডারী গানের আসর দেখতে পাবেন মাইজভান্ডার দরবার শরীফে। এটি একটি ধর্মীয় আধ্যাত্মিক সাধনার স্থান। গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী হযরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক) ১৮২৬ সালে জম্ম গ্রহন করেন। তিনি প্রবর্তন করেন মাইজভান্ডারী তরকিা। এই তরিক্বার অন্যতম প্রাণ পুরুষ সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারী, সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী, সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর মাজার শরীফ এখানে। প্রতিদিন লাখ লাখ আশেক ভক্ত এখানে ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে মহান অলীগণের মাজার জেয়ারত করতে আসেন।
কাজীবাড়ির ফাঁসিরঘর:

অষ্টাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত জমিদার কাজি শাহাব উদ্দিন চৌধুরী বাড়ি ফটিকছড়ির ভূজপুরের কাজি বাড়ির সন্তান। তাদের বিশাল জমিদার বাড়ি, মসজিদ, বিচার কাজরে জন্য ফাঁসির ঘর এখনো ভ্রমন পিপাসু ও ঐহিত্য সন্ধানীদের কাছে টানে।
ভুজপুর ও হারুয়ালছড়ির রাবার ড্যাম:

প্রাকৃতিক মৎস প্রজন্ন কেন্দ্র হালদা নদীর উজানে ভূজপুর রাবার ড্যাম স্থাপিত হয় ২০১১ সালে। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম বিমান বন্ধরে ডিজিটাল পদ্ধতিতে উদ্ভোধন করেন। ২০১৩ সালে হারুয়ালছড়ির ফটিকছড়ি খালের মধ্যে তৈরী হয় আরো একটি রাবার ড্যাম। দুই রাবার ড্যাম এলাকাযেন এক পানি খেলার নৈস্বর্গ…….। সেখানে একবারগেলে বার বারযেতে চাইবে মন……।
থাকা খাওয়া:
ফটিকছড়ি সদরে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের বিশাল বাংলো। ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে এখানে থাকতে পারেন। চা বাগানে থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট চা বাগানের অনুমতি ক্রমে ব্যবস্থা হতে পারে। ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, হেয়াকোতে রয়েছে বেসরকারী পর্যায়ে বোড়িং এব ব্যবস্থা। আর মাইজভান্ডার শরীফের যে কোন মঞ্জিলে অতিথি হতে পারেন অনায়াশে।



