২৮শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৭৮ টাকার মজুরিতে টিকে থাকার লড়াই

মে দিবস এলেও বদলায় না চা শ্রমিকের ভাগ্য

ওবাইদুল আকবর রুবেল

নারায়নহাটে অবস্থিত নেপচুন চা বাগান থেকে তোলা ছবি।

প্রতিদিন সকাল কিংবা কাজের ফাঁকে এক কাপ চা যেন আমাদের ক্লান্তি দূর করার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। আড্ডা-বিনোদনেও চায়ের জুড়ি নেই। অথচ এই চায়ের পেছনে যে মানুষের ঘাম ঝরে, তাদের জীবনসংগ্রামের গল্প আমরা অনেকেই জানি না।

আঠারো শতকে চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হওয়ার পর পেরিয়ে গেছে দুই শতাব্দীরও বেশি সময়। পৃথিবী বদলেছে, জীবনযাত্রা হয়েছে আধুনিক। কিন্তু ফটিকছড়ির চা-বাগান শ্রমিকদের জীবন আজও রয়ে গেছে সেই সাদা-কালো যুগের ছন্দহীন বাস্তবতায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি তাদের মজুরি; নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন কিংবা নারী-শিশুর নিরাপত্তা—যেন আলোর নিচেই অন্ধকার।

বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে দৈনিক ১৭৮ টাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন ফটিকছড়ির ১৮টি চা-বাগানের শ্রমিকরা। প্রতি বছর মে দিবস আসে-যায়, কিন্তু রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে একটি কুঁড়ি ও দুটি পাতা তুলে চা সরবরাহ করা এই শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে না।

মে দিবস উপলক্ষে সরেজমিনে নারায়ণহাট ইউনিয়নের নেপচুন চা বাগানে গিয়ে কথা হয় শ্রমিক তাহেরা বেগমের সঙ্গে। হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, “সারাদিন পরিশ্রম করে ১৭৮ টাকা পাই। এ টাকায় এখন দুই কেজি চালও হয় না।”

একই বাগানের শ্রমিক হনুফা বেগম জানান, “আমাদের অনেক পরিবারের সদস্য পাঁচ-ছয়জন। কিন্তু আয় করেন একজন। সেই টাকায় সবাইকে চলতে হয়। ছোট ভাঙাচোরা ঘরে গবাদিপশুসহ বসবাস করি। বাগান কর্তৃপক্ষ ঘর মেরামতের কথা বললেও তা বছরের পর বছর হয় না। কাজ না করলে থাকার জায়গাও থাকে না।”

শ্রমিক ও পঞ্চায়েত নেতাদের অভিযোগ, অধিকাংশ বাগানে শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয় না। শ্রম আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্তও অনেক ক্ষেত্রে মানা হয় না।

কৈয়াছড়া চা বাগানের শ্রমিক আনোয়ারা বেগম বলেন, “বাগানের বাইরে থাকলে আরও বেশি কষ্ট। যে টাকায় কাজ করি, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাই।”

কর্ণফুলী চা বাগানের শ্রমিক কৃষ্ণ মনি জানান, সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টানা কাজ করেও মজুরি মাত্র ১৭৮ টাকা। দুপুরে খাওয়ারও সময় মেলে না। প্রায় সব শ্রমিকেরই একই চিত্র।

অঞ্জনি ত্রিপুরা বলেন, “এত কম বেতনে পরিবার চালানো খুব কষ্টকর। ঝড়-বৃষ্টির সময় রেইনকোটও দেওয়া হয় না; একটি প্লাস্টিক দেওয়া হয়, তাতেও শরীর ভিজে যায়।”

পঞ্চায়েত নেতা মৃদুল কর্মকার বলেন, “চা শ্রমিকদের শ্রমে এই শিল্প দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের জীবন দারিদ্র্য ও বঞ্চনায় ঘেরা। প্রতি বছর মে দিবসে প্রতিশ্রুতি শুনি, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখি না।”

মে দিবস তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়—এই দিনটি হোক চা-বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, সম্মানজনক মজুরি ও মানবিক জীবনের দাবিকে জোরালো করার দিন।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?