খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি জীতেন বড়ুয়াকে বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাতে খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বর থেকে সদর থানা পুলিশ আটক করেছে। আটকাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শে রাতেই তাঁকে জেলাসদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে গতকাল (শুক্রবার) বিকেলে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তিনি সময় টিভি’র স্টাফ রিপোর্টার এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিনিধি। তিনি খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতিও।
তাঁকে গ্রেফতারের খবরটি খাগড়াছড়ির মূলধারার গণমাধ্যমের অধিকাংশ সহকর্মীরা এড়িয়ে গেছেন। ঘটনার একদিন পর শুক্রবার এবং আজ (শনিবার) জনপ্রিয় অনেক মিডিয়ায় আসলেও বেশিরভাগই হয় রাঙামাটি-চট্টগ্রাম অথবা ডেস্ক থেকে করা রিপোর্ট। শুধু তাই নয়, খাগড়াছড়িতে জীতেন বড়ুয়া’র অনেক সহকর্মী সমাজমাধ্যমে অজানা ভয়ে কোন পোস্টও করেননি।
জীতেন বড়ুয়াকে আটকের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার মোটর সাইকেলে চলার সময় শাপলাচত্বর এলাকা থেকে দুইজন সাদা পোশাকের পুলিশ ওনাকে টেনে হিঁচড়ে পুলিশভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। যা দেখতে দৃষ্টিকটু লেগেছে।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি মো. কায় কিসলু জানিয়েছেন, জীতেন বড়ুয়া’র বিরুদ্ধে সদর থানায় অন্তর্বতী সরকারের সময় দায়েরকৃত দুটি জিআর মামলা রয়েছে। গোপন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে আটক করা হয়েছে।
সাংবাদিক জীতেন বড়ুয়াকে গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্ট (আইএফজে), দক্ষিণ এশিয়া সাংবাদিক ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)।


জীতেন বড়ুয়া’র স্বজন ও সহকর্মীরা জানান, তাঁর বিরুদ্ধে রুজু হওয়া পাঁচটি মামলার মধ্যে চারটিই হলো পাঁচ-সাত বছর আগে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘটিত ঘটনার মামলা। আর একটি হলো, ৪ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের ওপর হামলার অভিযোগের মামলা।
সাংবাদিক জীতেন বড়ুয়াকে গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্ট (আইএফজে), দক্ষিণ এশিয়া সাংবাদিক ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)-এর পক্ষে বিএমএসএফ-র মহাসচিব সাংবাদিক খায়রুজ্জামান কামাল এক বিবৃতিতে জীতেন বড়ুয়া’র মুক্তির দাবি জানিয়ে উল্লেখ করেছেন, মূলত: রাজনৈতিক ইন্ধনে খাগড়াছড়ি জেলায় অনেক পেশাদার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলা খাগড়াছড়ি জেলার সাংবাদিক ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রামে কর্মরত পেশাদার সুপরিচিত সাংবাদিককেও জড়ানো হয়েছে।
প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সর্বোচ্চ একডজন পর্যন্ত মামলা রুজু করান। এরমধ্যে ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সমকাল প্রতিনিধি প্রদীপ চৌধুরীকে একটি সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে ‘মব’ করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। পাঁচ মাসের মাথায় প্রদীপ চৌধুরী নিম্ন আদালতে বার বার আবেদন করেও জামিন না পেয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন। কিন্তু সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় পঁচিশ সালের ২৭ মার্চ ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া’র মাধ্যমে জামিন লাভ করলেও কারামুক্ত হতে পারেননি। তাঁকে উপুর্যপরি আরো পাঁচটি মামলা দিয়ে প্রায় নয় মাস জেল খাটানো হয়।
এছাড়া এখনো খাগড়াছড়ির অনেক সাংবাদিক কেউ মামলার ভয়ে কেউ হামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
ঢাকার সাংবাদিক মামুন আব্দুল্লাহ্কেও খাগড়াছড়ির একটি মামলায় আসামী করা হয়েছে। এছাড়া মামলাভূক্ত অন্যান্য সাংবাদিকদের মধ্যে যমুনা টিভি’র শাহরিয়ার ইউনুছ, কালের কন্ঠ ও এটিএন বাংলা’র আবু দাউদ, দেশ টিভি’র অপু দত্ত এবং ভোরের কাগজের শঙ্কর চৌধুরী কঠিন সময় পার করছেন।
দীঘিনালায় চাঁদাবাজির অভিযোগে আরেকটি মিথ্যা মামলায় আজকের পত্রিকার চট্টগ্রাম অফিসের স্টাফ রিপোর্টার আবু বক্কর সিদ্দিক, রামগড় উপজেলা প্রতিনিধি বেলাল হোসেন এবং দীঘিনালা প্রতিনিধি আকতার হোসেনকে অভিযুক্ত করলেও তাঁরা ‘পিবিআই’র তদন্তে রেহাই পান। সেই মামলায় কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার তোফায়েল ও রিয়াদ নামের দুই সাংবাদিকসহ খাগড়াছড়ির আরো দুই সাংবাদিক চারমাস জেল খাটেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, মাত্র কয়েকদিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের ৫ আগস্ট পরবর্তী মামলাগুলো যাচাই-বাছাই, নির্দোষ-নিরাপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধ এবং আইনী প্রক্রিয়ায় বাদ দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
অথচ, খাগড়াছড়ি এখনো সরকারের পলিসির উল্টো ঘটনা ঘটছে। তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নতুন সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি না হলে খাগড়াছড়িতে সাংবাদিকদের আইনগত অধিকার এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে না।



