নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়

শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংকট; দুই বছর ধরে এসএসসিতে পাস করেনি কেউ

ওবাইদুল আকবর রুবেল

চট্টগ্রামের নবগঠিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে টানা দুই বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে মোট পাঁচজন শিক্ষার্থী অংশ নিলেও তাঁদের কেউ পাস করেনি। এর মধ্যে চলতি বছর মানবিক বিভাগের দুজন ও বিজ্ঞান বিভাগের একজন পরীক্ষার্থী ছিল। আগের বছর মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়েছিল দুজন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর আগের ফলাফল ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো। ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ গত দুই বছরেই বিদ্যালয়টির ফলাফলে বড় ধরনের অবনমন ঘটেছে।

ফলাফল বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, শুধু পাসের হার নয়, পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। একসময় প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিদ্যালয়টিতে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র তিনজন। অবশ্য এই একটি নয়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় আটটি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর চট্টগ্রাম বোর্ডে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল একটি। এ বছর পাসের হার শূন্য এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায়। এ দুই জেলায় তিনটি করে বিদ্যালয়ে পাসের হার শূন্য।

ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি খুবই কম। ফল প্রকাশের পরদিন বিদ্যালয়ে এসেছিল মাত্র দুজন ছাত্রী। শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতিও ছিল সীমিত। বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী শিক্ষক রয়েছেন আটজন; তবে সেদিন প্রধান শিক্ষকসহ উপস্থিত ছিলেন দু’জন।

বিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০০১ সালে ৮৪ শতক জমির ওপর স্থানীয় শিক্ষানুরাগী শওকত সিকদারসহ কয়েকজনের উদ্যোগে নারীশিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ২০০৪ সালে পাঠদানের অনুমোদন, ২০০৬ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্বীকৃতি এবং ২০০৮ সালে পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পায়। তবে প্রতিষ্ঠার ২৬ বছর পরও বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হয়নি। এতে আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। শিক্ষক-কর্মচারী ধরে রাখা, নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থী ভর্তি—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে বলে তাঁদের দাবি।

বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শান্তা আক্তার বলেন, “শিক্ষকের অভাবে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। বাংলার শিক্ষক থাকলেও গণিত ও ইংরেজির শিক্ষক নেই। বিদ্যালয়ে কোনো টিউবওয়েলও নেই। বিশুদ্ধ পানি আনতে পাশের বাড়িতে যেতে হয়। শিক্ষকরা নিয়মিত থাকলে আমাদের পড়ালেখায় মনোযোগ বাড়ত। আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময় অনেক শিক্ষার্থী ছিল। এখন বলতে গেলে কোনো শিক্ষার্থীই নেই।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুখেন্দ্র বিকাশ দে বলেন, “শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে এনটিআরসির মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক পাওয়া যাবে এবং পাঠদানের মানও বাড়বে। বর্তমানে শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা দিতে না পারায় তাঁদের ওপরও সেভাবে চাপ প্রয়োগ করা যায় না। এ অঞ্চলের নারীশিক্ষার কথা বিবেচনা করে বৃদ্ধ বয়সেও প্রতিষ্ঠানটি ধরে রেখেছি।”

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, “বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় আর্থিক সংকটে শিক্ষক-কর্মচারী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফলও আসছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি।”

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কী কারণে এমন ফলাফল হচ্ছে, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে কিছু সমস্যার কথা শুনেছি। সেগুলো খতিয়ে দেখে শিক্ষার মান ও ফলাফল উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?