সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ভাসমান সাদা মেঘের ছোঁয়া পেতে, একটু মাখামাখি করতে এ বরষায় দেশের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তের দূরাদূরান্ত হতে হাজারও সৌন্দয্য পিপাসুরা ছুটে আসছেন মেঘকন্যা সাজেকে। এ সময়টাই মেঘের রাজ্য সাজেকের রুপ, সৌন্দর্য উপভোগের উপযুক্ত সময়।
জুলাই মাসে টানা বৃষ্টি ও ভূমিধসের কারণে নয়দিন বন্ধ ছিল। এরপর সাজেক ভ্যলীসহ বাঘাইছড়ির সব পর্যটন স্পট পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।
ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সীমান্তবর্তী চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যের এ সাজেক ভ্যালি পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত। সমতল থেকে প্রায় তিন হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় সাজেক হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। এর আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। পাহাড় সবুজ আর মেঘের রাজত্ব সাজেক ভ্যালি। এখানে পাহাড় নতুন রূপে ধরা দেয় চোখে। চলে আলোর রোশনাই। মেঘেরা দল বেঁধে এসে ছুঁয়ে দিতে চায় জনপদ। কখনো কখনো মেঘের আড়ালে হারিয়ে যায় পাহাড় চূড়া। দূরে দৃষ্টি ফেললেই দেখা যায় ভারতের মিজোরাম রাজ্যের পাহাড়। এ যেন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে দেখা। ছিমছাম সাজানো-গোছানো একেকটা গ্রাম চুম্বকের মতো টানবে সৌন্দর্য পিপাসুদের। সাজেকে ঢুকতেই প্রথমে পড়ে রুইলুই পাড়া, যার উচ্চতা ১ হাজার ৮০০ ফুট। এর প্রবীণ জনগোষ্ঠী লুসাই। এছাড়া পাংখোয়া ও ত্রিপুরারাও বাস করে। সাজেকের শেষ গ্রাম কংলক পাড়া।
কংলক পাড়ায় গেলে প্রথমে হকচকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এখানকার তরুণীরা অনেক আধুনিক। টি-শার্ট, জিন্স, কেডস পড়েই তারা দৈনন্দিন কাজকর্ম করে। বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড এখানে পৌঁছাতে না পারলেও রয়েছে সৌরবিদ্যুত্। পাংখো পরিবারগুলোই সবচেয়ে আধুনিক। এজন্যই বোধ হয় আমাদের সমতলে কেউ কেতাদুরস্ত পোশাক-আশাক পরলে তাকে পাংখো বলে ক্ষেপানো হয়। রুইলুই এবং কংলক থেকে ভারতের মিজোরাম রাজ্য বেশ কাছাকাছি, হাঁটার দূরত্ব প্রায় ২ ঘণ্টার। এজন্য সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রায়, পোশাক-পরিচ্ছদে আধুনিকতার ছাপ পড়েছে। তাদের প্রায় সবাই ছেলেমেয়েকে বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে মিজোরামের উন্নত এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজে পড়ালেখার জন্য পাঠায়। এ কারণে তাদের অনেকেই ইংরেজিতে কথা বলতে অভ্যস্ত।
পাহাড়ি জীবনযাত্রায় তারাই সবচেয়ে উন্নত। কংলক পাড়া থেকে ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায়, যেখান থেকে কর্ণফুলী নদী উৎপন্ন হয়েছে। সাজেক যত জনপ্রিয় ও আকর্ষনীয় হয়ে উঠছে, আবার দিন দিন পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা রিসোর্ট, হোটেল বা পাকা স্থাপনা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের ক্ষেত্রে পর্যটকদের দৃষ্টিসীমায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সাজেকের সৌন্দর্য অক্ষুন্ন রাখতে দেশের এ অন্যতম পযটন কেন্দ্রটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের দাবি উঠেছে।
খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৬৯ কিলোমিটার। জনপ্রিয় এ পর্যটন কেন্দ্রটি রাঙ্গামাটি জেলার অন্তর্ভূক্ত হলেও পর্যটকদের যাতায়ত-যোগাযোগ সব খাগড়াছড়ি হয়ে। পাহাড়ী নদী কাচালং-মাচালং ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বৈচিত্রময় জীবনধারার দৃশ্য পেরিয়ে সাজেক প্রবেশদ্বারে রুইলুই পাড়া। রুইলুইতে পাংখো ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসতি। রুইলুই পাড়ায় সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় পর্যটকদের জন্য বেশকিছু বিনোদনের স্পট রয়েছে। এরমধ্যে হ্যারিজন গার্ডেন, ছায়াবীথি, রংধনু ব্রীজ, পাথরের বাগান উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য একাধিক বিশ্রামাঘার ও ক্লাবঘরও রয়েছে রুইলুই পাড়ায়। সাজেকের সবশেষ সীমানা কংলক। কংলক রুইলুই থেকে আরও দেড়ঘন্টার পায়ে হাঁটার পথ। কংলাকে পাংখোয়াদের নিবাস। পাংখোয়ারা সবসময় সবার উপরে থাকতে বিশ্বাসী তাই তারা সর্বোচ্চ চূড়ায় বসবাস করে। কংলাকের পরেই ভারতের মিজোরাম।
সাজেকের কারণেই অনেকটা পাল্টে গেছে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। বিশেষ করে পরিবহন ও হোটেল ব্যবসা জমে উঠেছে বেশ। সাজেকের পর্যটকরা খাগড়াছড়ি জেলা সদরে অবস্থানের ফলে হোটেলগুলোতে ভীড় লেগেই থাকে। সাজেক পর্যটন স্পট শুধু স্থানীয় পর্যটনের উন্নতি ঘটায়নি বরং পুরো খাগড়াছড়ি জেলার পর্যটন সেক্টরকে বদলে দিয়েছে। দেশ সেরা পর্যটন স্পটের স্থান দখলে এগিয়ে চলছে সবুজের বুকে মেঘের রাজত্ব করা সাজেক।
সাজেক প্রবেশের মাইল দু’য়েক আগে হাউসপাড়ার ঝর্ণাটিও বেশ মনোমুগ্ধকর। হাউস পাড়ার গড়ে উঠেছে চায়ের দোকান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তৈরি সাজেক পর্যটন কেন্দ্র ও যাতায়াত সড়ক স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান পাল্টে দিয়েছে। সেনাবাহিনীর পরিচালিত রিসোর্টও রয়েছে। সাজেক ভ্যালীতে এখন ছোট বড় মিলে ৩ শতাধিকের বেশী কটেজ, রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে আবার কিছু কিছু তারকা মানের। যেমন খাস্রাং রিসোর্ট, রুনমই ও সাজেক রিসোর্ট। এছাড়া মেঘপুঞ্জি, ছাউনি ইকো কুঠির, লুসাই ভিলেজ। সাপ্তাহিক খোলার দিন গুলোতে ভাড়া কিছুটা কম বেশী করা যায় কিন্তু টানা ছুটিতে এটি লাগাম ছাড়া হয়ে যায়। বন্ধের দিন ছাড়া অন্যদিনে দর দাম করে ভালো কটেজে বাজেটের মধ্যে থাকারও সুযোগ হয় কখনও কখনও। এক কথায় সাজেকে কটেজ রিসোর্টের সেবার মান বা মূল্য নির্ধারণ করে পর্যটকদের আনাগোনাকে ঘিরে। খাগড়াছড়ি জেলা সদর হতে সাজেক যেতে পিকআপ, চাঁদের গাড়ি ও সাফারি জীপ ভাড়ায় পাওয়া যায়।
খাগড়াছড়ি জেলা টুরিষ্ট পুলিশের বর্তমানশীল কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক নয়ন বড়ুয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে সাজেকের পর্যটকদের বেশী আগমন হয়। তাই এসময়টায় টুরিষ্ট পুলিশ পর্যটকদের সেবা ও সহযোগিতায় সর্বদা প্রস্তুত থাকে।



