বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ

এক প্রজন্ম শেখে, আরেক প্রজন্মও আসে; ইলা বড়ুয়ার অবসর নেই

সালাহউদ্দিন জিকু

এক প্রজন্ম তাঁর কাছ থেকে শিখেছে, সেই প্রজন্মের কেউ কেউ এখন নিজেদের সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠান। কিন্তু ইলা বড়ুয়ার সামনে প্রতিদিন বসে আরেক প্রজন্ম। হাতে চক-ডাস্টার, সামনে নতুন মুখ- এভাবেই চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ছয় বছর আগে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ থেকে এখনো নেননি অবসর।

সকালের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই বিদ্যালয়ের পথে হাঁতে থাকেন ইলা বড়ুয়া। বয়সের ভার শরীরে স্পষ্ট, হাঁটার গতি আগের মতো নেই। কিন্তু বিদ্যালয়ের ফটক পেরিয়ে শ্রেণিকক্ষে ঢুকতেই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। হাতে চক-ডাস্টার, সামনে শিক্ষার্থীরা। শুরু হয় পাঠদান।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক এখনো প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসেন। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নেন তিন থেকে চারটি ক্লাস। নবম ও দশম শ্রেণিতে হিসাববিজ্ঞান পড়ান। প্রয়োজন হলে অষ্টম শ্রেণির বাংলা ক্লাসও নেন। ২০১৯ সালে নিয়মিত চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি।


ইলা বড়ুয়ার কাছে শিক্ষকতা কখনো শুধু চাকরি ছিল না। এই পেশার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শুরু বাবাকে দেখে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান ইলা বড়ুয়ার বাবা ভূপেন্দ্র লাল বড়ুয়া সিলেটের একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতেন। বাবাকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়াতে দেখেই ছোটবেলায় শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
বাবার সেই পথ ধরেই একসময় নিজেও দাঁড়ান শ্রেণিকক্ষের সামনে। ১৯৮১ সালে হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ইলা বড়ুয়া। পরের বছর স্বামীর চাকরির কারণে ঢাকায় চলে যান। সেখানে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত খিলগাঁও গভর্নমেন্ট কলোনী স্কুলে এবং ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মাদারটেক বাসাবো বাগানবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৮ সালে আবার ফিরে আসেন হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর কেটে গেছে কয়েক দশক। সিনিয়র সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। হিসাববিজ্ঞান ছিল তাঁর মূল বিষয়। বছরের পর বছর তাঁর সামনে বসেছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। কেউ পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে, কেউ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার তাদের জায়গা নিয়েছে নতুন শিক্ষার্থীরা।


শিক্ষার্থীর প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে সময়। বদলেছে পাঠদানের পদ্ধতিও। কিন্তু বদলায়নি ইলা বড়ুয়ার শ্রেণিকক্ষে থাকার অভ্যাস। তাঁর হাতে পাঠ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী এখন কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের কেউ কেউ আজ নিজের সন্তানকে স্কুলে পাঠান। আর সেই বিদ্যালয়েই নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সামনে এখনো দাঁড়িয়ে থাকেন তাঁদের পুরোনো শিক্ষিকা।
২০১৯ সালে নিয়মিত চাকরি থেকে অবসরের পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাঁকে পুরোপুরি বিদায় দিতে চায়নি। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শিক্ষার্থীদের কাজে লাগবে- এই বিবেচনায় তাঁকে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা হয়। সেই থেকে প্রতিদিনের রুটিনে আবারও যুক্ত হয়েছে বিদ্যালয়। তিন-চারটি ক্লাস, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, খাতা দেখা, বুঝিয়ে দেওয়া- এভাবেই কেটে যায় তাঁর দিন। কখনো হিসাববিজ্ঞানের জটিল অঙ্ক, কখনো বাংলা ক্লাস। বয়সের ছাপ শরীরে থাকলেও শ্রেণিকক্ষে ঢোকার পর পাঠদানে তার কোনো ছাপ পড়ে না।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি এখন শুধু একজন শিক্ষক নন, অনেকটা অভিভাবকের মতো। তাঁর কাছে পাঠ্যবইয়ের বিষয় শেখার পাশাপাশি শেখে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও ভালো মানুষ হওয়ার পাঠ।
হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সহকর্মী জসিম উদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই কোমল হৃদয়ের ইলা ম্যাডামকে দেখে আসছি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। তিনি শিক্ষকতাকে কখনো শুধু পেশা হিসেবে নয়; বরং শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন কীভাবে একজন ভালো ও আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে হয়। তাঁর কাছ থেকে আমরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই পাইনি, পেয়েছি জীবন গড়ার শিক্ষাও।

ইলা বড়ুয়া। চার দশকের বেশি সময় আগে বাবাকে শ্রেণিকক্ষে দেখে যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, সেই পথচলা এখনো থামেনি। বদলেছে শুধু পরিচয়। নিয়মিত শিক্ষক থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। কিন্তু চক-ডাস্টার হাতে শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়ানোর দৃশ্যটি রয়ে গেছে আগের মতোই।

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ইলা বড়ুয়ার মতো শিক্ষকেরাই মনে করিয়ে দেন- শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়। একজন শিক্ষক চলে যান, কিন্তু তাঁর শেখানো জ্ঞান থেকে যায়। এক প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া সেই জ্ঞান আবার পৌঁছে যায় পরের প্রজন্মে। ইলা বড়ুয়া তাই চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ছয় বছর আগে। কিন্তু শিক্ষকতা থেকে নয়। প্রতিদিন সকালে তিনি এখনো বিদ্যালয়ের পথে হাঁটেন। শ্রেণিকক্ষে ঢোকেন। হাতে তুলে নেন চক-ডাস্টার। আর নতুন একদল শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়িয়ে আবারও শুরু করেন জ্ঞান বিতরণের সেই পুরোনো কাজ।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?