দৈনিক আজাদীর সাবেক মফস্বল সম্পাদক সুলতান আশরাফী ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় দৈনিক আজাদীতে কর্মরত ছিলেন। যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটির সঙ্গে।
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ও স্মৃতির গল্পটা একটু অন্য রকম। ২০০৮ সালে দৈনিক আজাদীতে আবেদন করার পর প্রায় ছয় মাস আমার পাঠানো সংবাদ প্রকাশিত হতো। কিন্তু প্রতিনিধির নাম ছাপা হতো না। ছয় মাস পর একদিন টিঅ্যান্ডটির একটি নম্বর থেকে ফোন এল। নম্বরটি ছিল ০৩১-৬১২৩৮০।
ফোন রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে এক বয়স্ক ব্যক্তি বললেন, ‘দৈনিক আজাদী থেকে বলছি। আচ্ছা, আপনি কী করেন? কোথায় কোথায় নিউজ পাঠান? আর কী কাজ করেন?’ আমার উত্তর শুনে তিনি ফোন রেখে দিলেন।
সপ্তাহখানেক পর আবার ফোন এল। সেই ব্যক্তি জানতে চাইলেন, ‘আপনি নাকি আজাদীর প্রতিনিধি পরিচয় দেন?’
আমি বললাম, ‘প্রশ্নই আসে না। আমি পরিচয় দেওয়ার মতো পরিচয় পেলে তো পরিচয় দেব। না হলে কেন দেব?’
আমার পাল্টা প্রশ্ন শুনে তিনি ফোন রেখে দিলেন।
তিন দিন পর আবার ফোন এল। এবার তিনি বললেন, ‘আপনি আগামীকাল সকাল ১০টার আগে অফিসে আসতে পারবেন?’ বললাম, ‘জি, পারব।’ পরদিন সকাল ১০টার আগেই পৌঁছে গেলাম দৈনিক আজাদী কার্যালয়ে। রিসেপশনে গিয়ে রবি ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় দিলাম। তিনি ইন্টারকমে কথা বলে আমাকে নিয়ে গেলেন তৃতীয় তলায়।
সেখানে সাদা পাঞ্জাবি পরা, সাদা দাড়িওয়ালা একজন মুরব্বিকে দেখিয়ে রবি ভাই বললেন, ‘উনি মফস্বল সম্পাদক।’ সালাম দিলাম। তিনি আমাকে কিছু নির্দেশনা দিলেন। এরপর দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গেলেন সহসম্পাদক, কবি অরুণ দাশগুপ্তের কাছে। আজাদী অফিসের সবাই তাঁকে ‘দাদামনি’ বলে ডাকতেন।
সুলতান আশরাফী সাহেব তাঁকে বললেন, ‘উনাকে ফটিকছড়ির দায়িত্ব দিতে চাচ্ছি।’ ফটিকছড়ির নাম শুনেই গল্প জুড়ে দিলেন কবি অরুণ দাশগুপ্ত। জানালেন, মীরসরাইয়ের হেয়াকো হয়ে নারায়ণহাট স্কুলে শিক্ষকতা করতেন তিনি। তাঁর বন্ধু অ্যাডভোকেট প্রকাশ বাবু।
আমি বললাম, ‘চিনি তাঁকে। দেখা হয়। ফটিকছড়ি আদালতের প্রবীণ আইনজীবী।’ এরপর একে একে কবি সিদ্দিক আহমদ স্যার, কবি রাশেদ রউফ স্যার, ইয়াসমিন আপা, লুসি আপা ও মাহবুবুল আলম স্যারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন আশরাফী সাহেব।
মাহবুবুল আলম স্যার একসময় ধর্মপুর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার বাবার শিক্ষক। নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, ‘আমার ছাত্রের সন্তান আমার হাউজের প্রতিনিধিত্ব করবেন, আমি আনন্দিত।’ দোয়া করে দিলেন তিনি।সবশেষে বাদল মামার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন সুলতান আশরাফী সাহেব।
এরপর কত স্মৃতি, কত অভিজ্ঞতা!
আমার মতো করে দৈনিক আজাদী কার্যালয়ে একজন মফস্বল প্রতিনিধিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সৌভাগ্য আর কারও হয়েছে কি না, জানি না। তবে আমার জীবনে সেই সৌভাগ্য এনে দিয়েছিলেন সুলতান আশরাফী সাহেব।
তিনি শুধু একজন মফস্বল সম্পাদক ছিলেন না; আমার মতো একজন নবীন সংবাদকর্মীর জন্য ছিলেন পথপ্রদর্শক। তাঁর সেই আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ আর স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো আজীবন মনে থাকবে। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। রয়ে গেছে তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়ের অমূল্য স্মৃতি। এই গুণী সাংবাদিকের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
লেখক: সাবেক প্রতিনিধি, দৈনিক আজাদী, ফটিকছড়ি; প্রকাশক, ফটিকছড়ি প্রতিদিন।



