১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ডলু আশ্রয়ণ স্বপ্নযাত্রা প্রাথমিক বিদ্যালয়

যে স্কুল ঘিরে স্বপ্ন বুনছে আশ্রয়ণের শিশুরা

ওবাইদুল আকবর রুবেল

ব্যস্ততম চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক ঘেঁষে সরকারের অর্থায়নে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি পাইন্দং ডলু আশ্রয়ণকেন্দ্র। যেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলেছে ৬৫০ ঘর ও ভূমিহীন পরিবারের। কাঞ্চননগর রাবারবাগান লাগোয়া এ গুচ্ছগ্রামে সাড়ে ৬ শতাধিক লাল-সবুজ ঘরে বসবাস করে প্রায় ৩ হাজার মানুষ। আশ্রয়ণে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও ছিল না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানকার শিশুদের ৫-৬ কিলোমিটার হেঁটে পাশের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে যেত। এতে সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেক পরিবার আশ্রয়ণে ঘর পেলেও অন্যত্র বসবাস করত। এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও ফটিকছড়ি ইউএনওর উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক সহযোগিতায় পাইন্দং ডলু আশ্রয়ণকেন্দ্রের প্রবেশমুখে প্রতিষ্ঠা হয় ‘ডলু মুজিববর্ষ আশ্রয়ণ স্বপ্নযাত্রা প্রাথমিক বিদ্যালয়’। ২০২২ সালে কাজ শুরু হলেও চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি স্কুলটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু হয়। বর্তমানে প্রতিদিন পাঠদান চলছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। এ স্কুল ঘিরে নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা।

স্কুলটির উদ্যোগ নিয়েছিলেন ফটিকছড়ির সাবেক ইউএনও সায়েদুল আরেফিন। তার পরবর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও মহিনুল হাসান ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ক্রমান্বয়ে ইউএনও সাব্বির রাহমান সানি, বর্তমান ইউএনও মোজাম্মেল হক চৌধুরী অনন্য অবদান রাখেন। এ ছাড়া পাইন্দং ইউপি চেয়ারম্যান একেএম সরওয়ার হোসেন স্বপন ও সাবেক মেম্বার সালাহউদ্দিন সরওয়ারের শ্রম, আর্থিক অনুদান ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবুল হোসেনের সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা পায়। স্থানীয়রা জানান, ‘এ স্কুল হওয়ায় সন্তানদের পড়ালেখা নিয়ে দুশ্চিন্তা কেটেছে।’ অধিকারবঞ্চিত আশ্রয়ণের শিশুদের সুশিক্ষার মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলটি দ্রুত সরকারিকরণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবকসহ স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা যায়, টিনশেড স্কুল ভবনের ভেতর-বাইর, প্রবেশমুখ, দেয়াল সব রাঙিয়ে তোলা হচ্ছে নানা রঙে। রঙতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জাতীয় ফলমূল, পশুপাখি, দেশ-প্রকৃতি, বাংলা-ইংরেজি বর্ণ, মীনা কার্টুন ও মনীষীদের ছবি। অভিভাবকদের মতামত নিতে রাখা হয়েছে আলাদা বক্স। ময়লা ফেলার জন্য ডাস্টবিনের ব্যবস্থাও আছে। স্কুলের সামনে বিশাল খেলার মাঠ। এ ছাড়া প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় শিশু শ্রেণির পাঠদানের কক্ষটি সাজানো হয়েছে নানা ধরনের খেলনা আর শিক্ষা উপকরণে। শিক্ষার্থীদের শিল্পমনা করে গড়ে তুলতে, দেশ-প্রকৃতি সম্পর্কে জানাতে এবং স্কুলগামী করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। রঙের ছোঁয়ায় স্বপ্নের স্কুল যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। শিক্ষার্থীরাও উৎফুল্ল।

শ্রেণিকক্ষের এক পাশে বাড়ির কাজ তৈরি করছিল দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শরিফা আক্তার। কথা হয় ওর সঙ্গে। শরিফা বলে, ‘আমার আব্বু-আম্মুসহ এখানে (আশ্রয়ণে) থাকি। আগে অন্য স্কুলে পড়তাম। এখানে স্কুল হওয়ার পর এখন পড়ালেখার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে পারি।’ তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. তায়েব বললো, ‘আগে অনেক দূরের স্কুলে হেঁটে কষ্ট করে যেতাম। এখন আমাদের বাড়ির মুখে স্কুল হওয়ায় প্রতিদিন স্কুল যেতে পারছি।’

আশ্রয়ণের বাসিন্দা ছালমা বেগম বলেন, ‘আমার তিন ছেলেমেয়ে ও বোনের তিন সন্তান এ স্কুলে পড়ে। আশ্রয়ণে আগে স্কুল ছিল না। ছেলেমেয়েরা কষ্ট করে দূরের স্কুলে গিয়ে পড়তো। এখন আশ্রয়ণেই স্কুল হয়েছে, ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলটি সরকারি হলে ছেলেমেয়েরা আরও সুযোগ পাবে।’

স্কুলের সহকারী শিক্ষক মানিক হোসেন বলেন, ‘আশ্রয়ণের শিশুদের রাষ্ট্রের সুনাগরিক হিসেবে গড়া তুলতে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আশা করি এ আশ্রয়ণের শিশুরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একদিন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম বলেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিনামূল্যে বই বিতরণের মধ্য দিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয় ডলু মুজিববর্ষ আশ্রয়ণ স্বপ্নযাত্রা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। স্কুলে প্রথম বছরেই ভর্তি হয় ১৬৪ শিক্ষার্থী। তাদের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত রয়েছেন চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা। বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের প্রক্রিয়া চলছে। সরকারি সুযোগসুবিধা পেলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের স্কুলটিও অন্য সব স্কুলের মতো আলো ছড়াবে।’

স্কুল প্রতিষ্ঠার অন্যতম সমন্বয়ক সাবেক ইউপি সদস্য সালাহউদ্দিন সরওয়ার বলেন, ‘আশ্রয়ণের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণে আমরা ২০২২ সালে স্কুল নির্মাণে কাজ শুরু করি। ২০২৪ সালে পাঠদান কার্যক্রম চালু হয়। স্কুল প্রতিষ্ঠায় সাবেক ইউএনও সায়েদুল আরেফিন, মহিনুল হাসান, সাব্বির রাহমান সানি, বর্তমান ইউএনও মোজাম্মেল হক চৌধুরী, পিআইও আবুল হোসেন ও পাইন্দং ইউপি চেয়ারম্যান সরোয়ার হোসেন স্বপনের সহযোগিতা রয়েছে।’

পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সহপাঠ্যক্রমের জন্য স্কুলের সামনে রয়েছে প্রশস্ত মাঠ। সেখানেই শিশুরা খেলছে। পাইন্দং ইউপি চেয়ারম্যান একেএম সরওয়ার হোসেন স্বপন বলেন, ‘স্কুলটির অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছি।’ বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য মাঠ ভরাট ও বাউন্ডারি ওয়াল তিনি নিজ উদ্যোগে করবেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ক্লিনিক আর শিক্ষার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। আগামীতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

স্বপ্নযাত্রা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম আরও এগিয়ে নিতে ভবিষ্যতে যথাযথ পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সব শিক্ষার্থীর জন্য স্কুল ড্রেসসহ বই, খাতা, কলম ও অন্যান্য উপকরণ দেওয়া হয়েছে। আশা করি এখান থেকে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করে নিজেদের প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিবারকে সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া ইতোমধ্যে স্কুলটি সরকারিকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।’

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?