আমি একজন নগর উদ্বাস্তু। শিশুকালে ফটিকছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত ভূজপুর থেকে চট্টগ্রাম মহানগরে আমার পরিবার মাইগ্রেশন করেছিলো। ঠিক যেন কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমানের উপন্যাস ‘ঘর ভাঙা ঘর’ এর গল্পের মতো জন্মস্থানের ওম ছেড়ে অন্যত্র শিকড় ছড়িয়ে বেঁচে থাকবার অপ্রাণ চেষ্টা করছি। নব্বই দশকে বাংলাদেশে পালাবদলের হাওয়ায় আমার বেড়ে ওঠা এভাবেই বদলে গিয়েছিলো। চট্টগ্রাম মহানগরের বাসিন্দা হাওয়ায় আমি তখন ফিলিংস ব্যান্ড এর গানের শ্রোতা। একজন পরিপূর্ণ শহুরে! আর এই ব্যান্ডের ভোকাল ও গিটারিষ্ট হলো বিখ্যাত ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস্। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ফিলিংস এর ‘লেইস ফিতা লেইস’ সলো অ্যালবাম রিলিজ হয়েছে। ফিতার ক্যাসেটে অবসরের সম্পূর্ণ সময় পুরো অ্যালবাম একটানা শুনছি। এই অ্যালবামের একটি গান ‘বায়োস্কোপের খেলা গীতিকার হলো জেমস্ ও আনন্দ। এই গানের একটা দৃশ্যপট হলো এমন; ‘পাকুর গাছের ছায়ায় ছায়ায়, যায় রে স্মৃতি যায় রে বেলা”।
পাকুড় গাছ আর পাকুড় গাছের ছায়া এই ল্যান্ডস্কেপ মগজে ও মননে গেঁথে গিয়েছিলো সেই সময়। চট্টগ্রাম মহানগর ও ভ্রমণের পথে পথে এই দীর্ঘকাল ধরে পাকুড় গাছ আমি কত খুঁজে ফিরেছি। পায়নি। জেমস্ ও আনন্দ এর পাকুড় গাছের ছায়ায় বসে স্মৃতি রোমন্থনে সময়ের মাত্রা জ্ঞান অতিক্রম করবার অভিজ্ঞতা সুতীব্রভাবে আমিও উপলদ্ধি করতে চেয়েছি। দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধানী মনে পাকুড় গাছের খোঁজ করেছি।
অবশেষে এই অগ্রাহয়নের শেষ দিকে মানিকছড়ি উপজেলার গাড়িটানা বাজারের নিকটে গাড়িটানা ত্রিপুরা পাড়ায় বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই পাকুড় গাছ ও গাছের ছায়ার দর্শন পেয়েছি। ছবিতে দৃশ্যমান পাকুড় গাছের লোকমুখে প্রচারিত বয়স অনুমান সাতশত বছরে অধিক। অনুমান সত্তুর মিটারের অধিক জায়গা জুড়ে পাকুড় গাছের বিস্তৃতি। ছোট পাহাড়ের উপর ত্রিপুরা পাড়া পাশে পাকুড় গাছের শরীর জুড়ে অর্কিড ও ফার্ন আর অসংখ্য পাখির উপস্থিতি অন্য জগত সৃষ্টি করেছে। রোদ আর শীতল তাপমাত্রার সাথে আলোছায়া নিয়ে গথিক রোমাঞ্চকর পরিবেশ শরীর ও মনে প্রভাব রাখে। জমিন, গাছ, শব্দের জগৎ ও দৃশ্যের জগৎ মিলিয়ে মানবদেহের সবক’টি ইন্দ্রিয় জাগ্রত করে পাকুড় গাছের ছায়ায় কিছু সময় অতিবাহিত করলে স্মৃতি রোমন্থনের সঙ্গে সময়কে অতিক্রম করা সম্ভব হয়। শুনসান পাকুড় গাছের মুখোমুখি হয়ে নিজের ভিতর প্রবেশ করলে সময় অতিক্রমের সাথে সাথে পরমের সান্নিধ্য হাজির হয়। হাজির হয় আলৌকিক ও আলকেমি মুহূর্ত। এই অভিজ্ঞতায় হয়ত আপনি হয়ে উঠবেন একজন আলকেমিষ্ট !
যেভাবে যাবেন :
ফটিকছড়ি উপজেলার কাজীর হাট বাজার হতে গাড়িটানা রোড ধরে চলে যাবেন আছিয়া চা বাগান। চা বাগান দর্শন ও অতিক্রম করে গাড়িটানা বাজারের একটু আগে পাহাড়ের উপর গাড়িটানা ত্রিপুরা পাড়া। সড়কের ডান পাশে পাহাড় পাদদেশে শতবর্ষী আরো দুটো পাকুড় গাছের দাঁড়িয়ে থেকে আপনাকে অভ্যর্থনা করবে। পাহাড়ে ওঠার ইটের রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে গেলেই কাঙ্ক্ষিত পাকুড় গাছের সাক্ষাৎ পাবেন।
বাহন :
যেকোনো ব্যক্তিগত বাহন নিয়ে যেতে পারবেন। আর পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হলে অক্সিজেন মোড় থেকে কাজীরহাট বাজার পর্যন্ত বাসে পৌঁছে কাজীরহাট বাজার থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে গাড়িটানা পর্যন্ত যেতে পারবেন।
লেখক : অ্যাডভোকেট ও পরিব্রাজক
Fb : https://www.facebook.com/faysal.ovi.2024



