২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় শুরু হয় পরিবেশ ধ্বংসকারীদের মহাযজ্ঞ। ফটিকছড়ি উপজেলায় একের পর এক পাহাড় ও টিলা কেটে সাবাড় করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল ও পদবীর প্রভাব কাটিয়ে গত দেড় বছরে নিধন করা হয়েছে অন্তত শতাধিক পাহাড়-টিলা। অবাধে মাটি কাটার ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে কৃষিজমি, বসতভিটা, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন নজরদারী বাড়ালেও প্রতিদিন চলছে প্রশাসন- চোর-পুলিশ খেলা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাসিন্দারা জানান, “যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারাই পাহাড় কাটে। মাটিখেকোরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করলে বিপদে পড়তে হয়। তাই সবাই নীরব। ফটিকছড়ির পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন দরকার”।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মাটিদস্যূরা দীর্ঘদিন ধরে ফটিকছড়ির বিভিন্ন ইউনিয়নে পাহাড় ও টিলা কেটে মাটি বিক্রি করে আসছে। এসব মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে ইটভাটা, আবাসন ও সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে। দিনের আলো ও রাতের আঁধারে ভেকু ও ডাম্পট্রাক দিয়ে নির্বিঘ্নে পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে অনেক এলাকায় পাহাড় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে সমতলে পরিণত হয়েছে। অবৈধ পাহাড় কাটার কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
তাদের মতে, পাহাড় ও টিলা ধ্বংসের ফলে ভূ-প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে, সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা ও ফসলি জমির ক্ষয়। এতে করে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকা পড়ছে চরম অনিশ্চয়তায়।
সরেজমিনে গত শনি ও রোববার পাইন্দং, ভূজপুর ও বাগানবাজার ইউনিয়নের একাধিক এলাকা ঘুরে দেখা যায় পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উপজেলার পাইন্দং, ভূজপুর, নারায়ণহাট, দাঁতমারা, বাগান বাজার, সুয়াবিল, হারুয়ালছড়ি ও কাঞ্চন নগর ইউনিয়নে সক্রিয় রয়েছে সর্বদলীয় একাধিক শক্তিশালী মাটি-সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এসব চক্র দিনের বেলায় আত্মগোপনে থাকে, আর রাতের আঁধারে শুরু করে পাহাড় ও কৃষি জমি কাটার কাজ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনের অভিযানের সময়সূচি সম্পর্কে আগাম খবর পেয়ে যায় মাটিখেকোরা। ফলে কৌশল বদলে রাতভিত্তিক অপারেশন চালানো হচ্ছে নিয়মিত। পাইন্দং ইউনিয়নের ফকিরাচাঁন, যোগিনাঘাটা, আমতল এলাকায় রাতের আঁধারে কয়েকটি এক্সকেভেটর দিয়ে কাটা হচ্ছে কৃষিজমির টপসয়েল। ভূজপুর ইউনিয়নের আন্ধার মানিক গলাচিপা এলাকা, হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের আপন ব্রিকফিল্ড সংলগ্ন বাংলাবাজার সরকার বাড়ি এলাকা, ভূজপুর ইউনিয়নের আছিয়া চা-বাগান সংলগ্ন মা আমেনা লেয়ার ফার্ম এলাকা, বাগান বাজার ইউনিয়নের লালমাই এলাকায় দিন দুপুরেই ভবন নির্মাণের জন্য পাহাড়-টিলা কাটা হচ্ছে প্রকাশ্যে। এছাড়াও বাগমারা এলাকায় মাহবুবুল হকের বসত টিলা, গার্ডের দোকান এলাকায় নবী মাস্টারের টিলাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনের আলো ও রাতের আঁধারে ভেকু ও ডাম্পট্রাক দিয়ে নির্বিঘ্নে পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের রিসার্চ অফিসার মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, “কর্তনকৃত স্থানগুলো পরিদর্শন করে শিগগিরই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন,“মাটি কাটার সংবাদ পেলেই রাত-দিন নির্বিশেষে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। টিলা-পাহাড় ও কৃষিজমির টপসয়েল কাটা আমলযোগ্য অপরাধ। প্রয়োজনে পুলিশ প্রশাসন স্বপ্রণোদিতভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে।”



