তথ্যপ্রযুক্তিতে ততোটা কাবিল ছিলাম না কখনোই-এখনও না। প্রযুক্তির বদৌলতে মানুষ এখন চাইলেই আপন মানুষের কাছে থাকতে পারেন। যোগাযোগ এখন মুক্ত-অবারিত এক বিষয়। আর সেই সূত্র ধরেই, আমরা সদ্যবিগত বছরের মহান ষোল ডিসেম্বর সূচনা কলরাম, ‘ফটিকছড়ি প্রতিদিন’। ফটিকছড়িভিত্তিক জনপরিসরে বিস্তৃত আলোচনা এবং জনআঙ্খাক্ষা সৃষ্টির প্রেরণা থেকেই আমাদের এই নবযাত্রা। গেলো দুই সপ্তাহে হাজার হাজার দর্শক শ্রোতার উজানে যাঁরা শামিল হয়েছেন; আপনাদের প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা এবং সম্মানসিক্ত ভালোবাসা। আহ্বান জানাই, মন খুলে আমাদের পরামর্শ দিন, দেখিয়ে দিন আমাদের ভুলগুলো, ধরিয়ে দিন যতো ব্যর্থতাসমূহ।
‘ফটিকছড়ি প্রতিদিন’ একটি স্বপ্নের নাম হতে পারে। কারণ ফটিকছড়ি দেশের সমতল অঞ্চলে আয়তনে এবং জনসংখ্যায় একক বৃহত্তম উপজেলা। একটি উপজেলা হলেও দেশের শিক্ষা-অর্থনীতি-সাহিত্য-স্বাস্থ্য-ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে ফটিকছড়ি উপজেলাবাসীর বিশাল অবদান রয়েছে। আশি আর নব্বই দশকের অসহিষ্ণু রাজনীতি কেড়ে নিয়েছে আমাদের অনেক মেধাবী বড়ো ভাই এবং বন্ধুদের। পরম করুণাময়ের দয়ায়, আমাদের ফটিকছড়ি এখন একটি সমৃদ্ধ ও শান্ত জনপদ। তাই আসুন, সবাই মিলে নতুন নতুন ভাবনা বিনিময়ের চিন্তারাজ্যে বিচরণ শুরু করি।
জন্মসূত্রে যাঁরা ফটিকছড়ি উপজেলার বাসিন্দা, তাঁদের মধ্যে যাঁরা ফেইসবুকে আছেন-আপনাদের সকলকে স্বাগত জানাই ‘ফটিকছড়ি প্রতিদিন’ দলে। যতোদুরেই থাকুন-যে পেশাতেই থাকুন, দয়া করে নিজেও যোগ দিন-অন্যদেরও যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করুন।
হালদা নদী’র সাথে ফটিকছড়ির অধিকাংশ মানুষের বহুমাত্রিক স্মৃতি জড়ানো। আমার অবাক লাগে, একটি নদী সেই উত্তর মাথা থেকে এঁকেবেঁকে গেছে দক্ষিণ মাথাটুক। বলা চলে, এক নদীতে আমরা আবদ্ধ পুরো ফটিকছড়িবাসী। বিস্ময়ে ভাবি, দেশের সব নদী মাঝে মাঝে বিগড়ে উঠে, সোনালী ফসল-পুকুর ভরা মাছ-বসতবাড়ী…..ভাসিয়ে নেয়। কিন্তু হালদা নদী’র ইতিহাসে সেইরকম ঘটনা খুবই কম। ফটিকছড়ির জন্য এ এক বার আউলিয়ার রহমত। হালদা নদী কিন্তু আমার গ্রামের খুব কাছ দিয়েই গেছে। আবার যখন নাজিরহাট কলেজে পড়ি তখনও পেয়েছি কাছে…এই নদীটি নিয়ে প্রয়াত সাংবাদিক মুহাম্মদ ইদ্রিস ভাই অনেক স্বপ্ন বুনেছিলেন। আজ তিনি নেই…। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কৃতী অধ্যাপক এবং ফটিকছড়ির অন্যতম ব্যক্তিত্ব মঞ্জুরুল কিবরিয়া হালদা বাঁচাতে অনেকদূর এগিয়েছেন। হালদা’র প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় আমরা যাঁরা, হালদা পাড়ের মানুষ, আমাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে।
শত বছর বছর ধরেই ফটিকছড়ি উপজেলায় চা চাষ হচ্ছে। ছোটকাল থেকেই চা কারখানার শব্দ শুনে আসছি। আমার গ্রাম ভূজপুরের “সিংহরিয়া” থেকে কৈয়াছড়া ও আছিয়া চা বাগান (এখন ব্র্যাক’র মালিকানায়) খুব কাছেই। কালীপূজা, দূর্গাপূজা’র সময় চা বাগানে বিপুল আনন্দের আসর বসতো…যাত্রাপালা…নাটক…পালাগান…হাউজি……তাস…….। চা জনগোষ্ঠীর বিপন্ন জীবনের চিত্র, এখনো আমাকে কাঁদায়। সভ্যতার এই সময়েও চা শ্রমিকরা মানব+ইতর= মানুষ (?) জীবনের ঘানি টানছেন আর সাহেব…বড়োাবাবু….টিলাবাবু’রা থাকেন আমোদ ফূর্তিতে…..
মসজিদ-মাদ্রাসা-মাজার-মন্দির-বিহারের জনপদ ফটিকছড়ি। চাঁটগাঁইয়া-নন চাঁটগাঁইয়া মিলে ফটিকছড়ি। সমতল-পাহাড়-টিলা-ছড়া-খাল-নদী’র ফটিকছড়ি। ঐতিহ্যবাহী “মাইজভান্ডার দরবার শরীফ”-র কথা বাদ দিলে তো ফটিকছড়ির আর কিছুই থাকে না। উপ-মহাদেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর নানা দেশে নানা প্রান্তে ছড়িয়েছে মাইজভান্ডারি চিন্তা ও চর্চা। দেশসেরা দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যও ফটিকছড়ি সুপ্রসিদ্ধ। খিরামের চাকমা….বড়বিল-আনন্দপুর..সাপমারা..হরিণমারা’র ত্রিপুরা… শোভনছড়ি-কালাপান্যার মারমা অথবা উদালিয়া চা বাগানের গুর্খা-নেপালীদের কথা কী বাদ দেয়া যায়?
আগেতো ফটিকছড়ি মানেই মেলা’র জনপদ। বিশেষ করে নারায়নহাট থেকে একেবারে ধর্মপুর-সমিতিরহাট পর্যন্ত কতো নামের কতো রঙের মেলা যে হতো? গত একদশকে মেলার খবর কমেছে। অথচ এসব মেলার মাধ্যমেই ফটিকছড়ির লোকশিল্প-কারুশিল্প-মানুষে মানুষে সম্মিলন-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বহেছিলো ভবিষ্যতের পানে।
শুষ্ক মৌসুমের পুরোটা জুড়েই ফটিকছড়ি মধ্যাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পীর আইলিয়াদের স্মরণে মজে উঠে জিকির-আশকানে। উরশের টানে আর তবারুকের ঘ্রাণ যেনো নিত্যদৃশ্য। সারাদেশ থেকে লাখো মানুষের পদচারণায় উর্বর হয়ে উঠে আমাদের প্রিয় ফটিকছড়ি।
আমি বলবো, ফটিকছড়ির গভীরতম ইতিহাস জানাটা জরুরী। আমার তো অবাক লাগে, কতো কতো আগে ভূজপুরের ঐতিহাসিক কোম্পানী টিলা, কারাগার’র প্রতœচিহ্ন কিংবা আদালত খাঁ ও কাজী বাড়ীর স্মৃতিচিহ্ন কী নিদারুণ অবহেলায় পড়ে আছে! সাহিত্যিক অশোক বড়–য়া, ড. এনামুল হক, মনসুর মুসা, অর্থনীতিবিদ এইচ এল দে…..দীর্ঘতম সেই মহীয়ান ফর্দ। আমরা নিজেদের অন্ধকারে থাকি বলেই নিজের ছায়াতে নিজেই …….। সো, এখন থেকে যাত্রা শুরু হোক মরহুম শ্রদ্ধেয় চৌধুরী আহমদ ছফা’র আলোতে। ওনার সেরকম একটা বই আছে নাম “কালান্তর সাহিত্যে ফটিকছড়ির বিস্মৃত সাহিত্যধারা”। যেখানে সাহিত্যের শোণিতধারায় তুলে এনেছেন ফটিকছড়ি খানদানি ইতিহাসও।
উপদেষ্টা সম্পাদক- ফটিকছড়ি প্রতিদিন



