কেউ ফুল হাতে দাঁড়িয়ে, কেউবা চোখ মুছছেন নিঃশব্দে। প্রিয় শিক্ষককে শেষবারের মতো সম্মান জানাতে যেন এক আবেগের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। দীর্ঘ ৩১ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে অবসরে গেলেন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রুইম্রোচাই কার্বারী। আর তাঁর বিদায়কে ঘিরে শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসী আয়োজন করলেন এক ব্যতিক্রমধর্মী, হৃদয়ছোঁয়া সংবর্ধনার।
শনিবার (৯ মে) দুপুরে বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই বহু বছর পর ছুটে এসেছেন শুধু প্রিয় স্যারকে একনজর দেখতে। বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখ থেকেই ছিল উৎসবের আমেজ, তবে সেই আনন্দের ভেতর লুকিয়ে ছিল বিচ্ছেদের কষ্ট।

প্রিয় শিক্ষককে সুসজ্জিত গাড়িতে করে বিদ্যালয়ে আনা হলে পুরো পরিবেশ আবেগে ভারী হয়ে ওঠে। মঞ্চে ওঠার সময় শিক্ষার্থীদের করতালি আর সহকর্মীদের ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। কেউ স্মৃতিচারণ করেন তাঁর কঠোর শৃঙ্খলার কথা, কেউ বলেন তাঁর স্নেহময় আচরণের গল্প।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি হারুন অর রশিদ। প্রধান অতিথি ছিলেন রামগড় উপজেলা শিক্ষা অফিসার হ্যাপী চাকমা। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন পৌর বিএনপির সভাপতি বাহার উদ্দিন, সাবেক প্রধান শিক্ষক মনির হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলী আজগর, জসিম উদ্দিন, উচিং থোয়াই মগসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিসকাত আরা মাহফুজ আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, স্যারের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তিনি শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন আমাদের অভিভাবক। সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ আর সততার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আমাদের সারাজীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে।
বিদায়ী বক্তব্যে রুইম্রোচাই কার্বারীও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু পেশা ছিল না, এটি ছিল আমার জীবনের সাধনা। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। এই বিদ্যালয়, সহকর্মী আর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আজ আমি অবসরে যাচ্ছি, কিন্তু এই বিদ্যালয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা কখনো ফুরাবে না। আমি চাই, এখানকার শিক্ষার্থীরা সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলুক।
সূত্র জানায়, রুইম্রোচাই কার্বারী ১৯৯৫ সালে দীঘিনালা উপজেলার ভীরবাহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৯৭ সালে রামগড় উপজেলার নিউ তৈছাকমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি পাতাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রায় ১৮ বছর তিনি একই বিদ্যালয়ে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাটিয়েছেন।
অনুষ্ঠান শেষে প্রিয় শিক্ষককে রাজকীয় আয়োজনে সুসজ্জিত গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। বিদায়ের সেই মুহূর্তে অনেক শিক্ষার্থীর চোখে দেখা যায় অশ্রু। যেন একজন শিক্ষক নন, পরিবারেরই একজন প্রিয় মানুষকে বিদায় জানাচ্ছিল পুরো বিদ্যালয়।
পাতাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই আয়োজন আবারও মনে করিয়ে দিল- একজন আদর্শ শিক্ষক কখনো শুধু পাঠদান করেন না, তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন আজীবনের জন্য।



