সবাই প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে

এস এম আক্কাছ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দেশের অন্যতম বৃহৎ চট্টগ্রাম-২ সংসদীয় আসন। যেটি ফটিকছড়ি ও ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত। এটি একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি নদী, উর্বর পলি, সবুজ শস্যক্ষেত, সমৃদ্ধ চা ও রাবার-বাগান, আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্র, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এবং অফুরন্ত সম্ভাবনার এক জীবন্ত ভূখণ্ড। পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা, ধুরুং ও সর্তার জলধারা যেমন এই জনপদকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য, তেমনি এখানকার মানুষের শ্রম, মেধা ও সহনশীলতা যুগের পর যুগ দেশের কৃষি, চা, মৎস্য ও অপার বাণিজ্যে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। প্রকৃতির আশীর্বাদে সমৃদ্ধ হলেও উন্নয়নের মৌলিক সূচকে এখনো তার সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি এখানে।

সাত লাখের বেশি মানুষের বসবাস এখানে। কৃষি, মৎস্য, অর্থনীতি, চা ও রাবার বাগান এবং কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যে সম্ভাবনাময় হলেও শষ্যভান্ডার, হালদা এবং মাইজভান্ডার শরীফ এই অঞ্চলকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় হলেও এখানে সরাসরি রেল যোগাযোগ, ছোট ছেট শিল্পায়ন, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, হিমাগার, গ্যাস সরবরাহ, অপ্রতুল অবকাঠামো, মিনি ষ্ট্যেডিয়াম, সড়ক যোগাযোগ এবং নানাবিধ নাগরিক সুবিধায় কাঙ্খিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে উন্নয়নের সম্ভাবনা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি দৃশ্যমান ফারাক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সফর সবার কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ ও উন্নয়নমূলক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সকলের প্রত্যাশা, সফরকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলকে তিনটি উপজেলা, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত, আজাদীবাজার ও হেঁয়াকোকে পৌরসভায় উন্নীত, নাজিরহাট রেল লাইনের সাথে ফটিকছড়িকে যুক্তকরণ, দক্ষিণে আরেকটি ট্যাকনিক্যল কলেজ, পূণরায় ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্ট চালু, সদরের ২০ শয্যা হাসপাতালকে পূর্ণঙ্গে উন্নীত, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, পার্শবর্তী সেমুতং থেকে ফটিকছড়িতে গ্যাস সরবরাহ, হালদা, ধুরুং ও সর্তা নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা, রাবার ও চা-বাগানগুলোকে পর্যটন শিল্পে উন্নীত করা এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগের মতো দাবিগুলো গুরুত্ব পাবে।

আশাকরছি প্রধানমন্ত্রীর এই সফর, নতুন প্রত্যাশার নবদিগন্ত সূচনা করবে। কিছু মুহূর্ত কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়, ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণ করে। এখানকার মানুষের কাছে এই সফরও তেমনই এক দারুণ মুহূর্ত। প্রশাসনিক কর্মসূচির বাইরেও এটি উন্নয়ন, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রধানমন্ত্রীর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে ফটিকছড়ির সাথে। মুক্তিযুদ্ধে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের মানুষ স্বগৌরবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। স্মৃতিবিজড়িত স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্য ভূমিকা দেখিয়েছেন তাঁরা। ফলে উন্নয়ন তাঁর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলোর অন্যতম। আলেম-ওলামাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম মিলিয়ে সফরটি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেখাচ্ছে।

উন্নয়নের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক সহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ একটি গেম-চেঞ্জার প্রকল্প হতে পারে। গ্যাসপ্রাপ্তিটা একেবারেই মৌলিক দাবী আর রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে ফটিকছড়ির সংযোগও এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি ন্যায্য উন্নয়নের দাবি। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার মানুষ নিজ অঞ্চলে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। এখানে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ জীবিকার সন্ধানে প্রবাস ও নগরমুখী। ছোটখাটো শিল্পাঞ্চল, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, চা, রাবার, কৃষি-অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন বিনিয়োগ এ এলাকার অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে নদীভাঙন প্রতিরোধ, খাল সংস্কার, চা ও রাবার শিল্পের বিকাশে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রকৃতিকে রক্ষা করেই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব। এখানকার কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দাবির ভাষা প্রায় এক ও অভিন্ন। তারা চান পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, সুষম উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত বৈষম্যের অবসান। তাদের প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে চার লেনের আঞ্চলিক মহাসড়ক, রেল সংযোগ, গ্যাস সরবরাহ, ছোটখানো শিল্পায়ন, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা এবং চা ও রাবার বাগানকে পর্যটন খাতে উন্নীত করা।

প্রধানমন্ত্রীর আগমণকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশাকে বাস্তবায়নে এগিয়ে নেওয়ার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। শিক্ষা, যোগাযোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পায়নভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনাই অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করবে।

পরিশেষে সহানুভূতি নয়, সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলতে চাই। দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই উন্নয়নের নতুন অধ্যায় রচিত হতে পারে এমন প্রত্যাশা হাজারো কণ্ঠে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। সফরটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা হবে না; বরং এটি হবে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের, পরিকল্পনা থেকে অর্জনের এবং নতুন উন্নয়নযাত্রার সূচনা। উপজেলাবাসী সেই নতুন ভোরের অপেক্ষায় সবাই প্রধানমন্ত্রীর দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে।

লেখক: সম্পাদক, ফটিকছড়ি প্রতিদিন।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?