১৯৭১ সালে ফটিকছড়ির ধর্মপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেনেীর ছাত্র মোহাম্মদ শফিউল আলম। যুদ্ধের ডামা-ঢোলে স্কুল বন্ধ। কোন কাজ নাই। তখন জুন মাস। সারা দেশের যুদ্ধের খবর, পাক বাহিনীর নির্যাতনের খবর বিদ্রোহী করে তুলল। তিন বন্ধু আনোয়ার পাশা সিদ্দিকী, খোরশেদুল আলম এবং আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যুদ্ধে যাব। মা-বাবা যেতে দেবেনা। তাই এক রাতে পালানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। আনোয়ার পাশা নির্দিষ্ট সময়ের একটু আগেই বের হয়ে পড়ে। আমি আর খোরশেদ দেরী হওয়াতে অভিভাবকরা ধরে পেলে। পরে আরেক দিন ঠিকই পালাই। পায়ে হেঁটে, পোক-জোঁকের কামড় খেয়ে বাগান বাজার-রামগড় হয়ে সাব্রুম গিয়ে তিন বন্ধু এক হই। তারপর ত্রিপুরার হরিনা ক্যাম্পে যাই। সেখানে বাঙ্গালী ডাক্তার জাকারিয়া চিকিৎসা দেন। প্রথমে আমাদের ছোট বলে ট্রেনিং এ নেয়নি। বেশ কবার চেষ্টা করে যোগ দিই ট্রেনিংএ। সেখানে খাবার আর থাকার অনেক কষ্ট পেলাম। চাচাতো ভাই কাঞ্চন মাস্টার থাকতো দুবাই শহরে। ২ টাকা ৫০ পয়সা
টিকিট লাগিয়ে তার কাছে চিঠি লিখলাম। তিনি সেখানকার প্রতিষ্টানের জনৈক ম্যানেজারের সহায়তায় ভারতের হায়দারাবাদ থেকে ট্রেনিং সেন্টারে আমরা তিন বন্ধুর জন্য ৩শ টাকা মানি অর্ডার করে পাঠায়। ট্রেনিং শেষে দেয়া হয় আরো ৫০ টাকা করে। অক্টোবরে দেশে আসি। এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা এবং যুবকদের নিয়ে প্রতিরোধ দূর্ঘ্য গড়ে তুলি। ফটিকছড়ি-রাউজানের সীমান্ত এলাকায় রাজাকার এবং পাকিস্থানী বাহিনী বেশ কিছু নির্যাতন চালায়। বিভিন্ন ভাবে প্রতিরোধ গড়তে আমরা আরো সংগঠিত হই। এ সময় একদিন ১০ ডিসেম্বর শুক্রবার পাশবর্তী লষ্কর উজির বাড়ি এলাকায় পাক বাহিনীর আক্রমন প্রতিহত করার একদিন পর ১২ ডিসেম্বর হলদিয়ার মাদাইম্যেহাট (আমির হাট) এলাকায় পাক বাহিনী অবস্থান নিয়ে আমাদের দুর্ঘ্যে হানা দেয়। প্রথম খবর পাই সকাল ৭টার দিকে। বন্ধু গোলাপ (পেট্রোল গোলাপ) কে নিয়ে আমি বাড়ির কলকিত্যে পুকুর পাড় থেকে ফায়ার করতে করতে শত্রু বাহিনীকে আমাদের শক্ত অবস্থানের কথা জানান দিই। আরব ফকির বাড়ি, মিজ্জির বাড়ি হয়ে খনখাইয়া খাল-পুতাখোলা অবস্থান পাকা করি। সাথে ধীরে ধীরে অপরাপর মুক্তিযোদ্ধারা আসতে শুরু করে। নানুপুর থেকে গরুর গাড়ি করে মর্টার সেল নিয়ে ইপিআর (ইষ্ট পাকিস্থান রেজিমেন্ট) যোগ দেয় আমাদের সাথে। এটি ফটিকছড়ি-রাউজানের স্মরণ কালের ভয়াবহ যুদ্ধ ক্ষেত্র। দীর্ঘক্ষণ আমাদের প্রতিরোধের মুখে পাক বাহিনী পিছনে ফিরে যায়। আমরা খবর পেয়ে আরো সামনে অগ্রসর হই। সর্তা খাল পার হয়ে হলদিয়ার সিকদার বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব দিকে জনৈক গুন্ন মিয়ার বাড়ির সামনে পুকুর পাড়ে একটি খেজুর গাছের আড়াল থেকে গর্জনিয়া রাবার বাগানের কাছে অবস্থানরত পাক বাহিনীকে মোকাবেলা করতে লাগলাম। তখন দুপুর গড়িয়ে আসরের কাছে। হঠাৎ একটি গুলি আমার বুক ছিড়ে পিঠ
দিয়ে বের হয়ে যায়। বুকে চিনচিন একটি ব্যথা অনুভব করলাম। হাত দিতেই রক্ত দেখতে পলোম। পাশে ছিল মুক্তিযোদ্ধা জহুর এবং কালাম। তারা আমাকে ধরে গুন্নু মিয়ার কাচারী ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থান করছিল ধানের কাজ করতে আসা নোয়াখালির এক অসুস্থ শ্রমিক। তিনি তামাকে হোক্কা টানছিলেন। সেখান থেকে আমার বুক-পিটে ক্ষত স্থানে তামাক দিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে দেয় আমাকে। তারপর গুন্নু মিয়ার বড় ছেলে (নাম জানা নেই, পরে সে বাড়ি গেলে পাক বাহিনী
তাকে এবং নোয়াখালির সেই অসুস্থ শ্রমিক হত্যা করে) তাকে তিনটি অস্ত্র দিয়ে সর্তা খালের পশ্চিম পাড়ে কমিটি বাজার উঠার জন্য বলে জহুর এবং কালাম আমাকে ভার করে খালের চরে আসলে জহুর পায়ে গুলবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটে পড়ে। কালাম দ্রুত সরে যায়। আমি অনেকক্ষণ পড়ে রইলাম। তারপর অনেক কষ্টে হেঁটে সর্তা খালে পড়লাম। কমিটি বাজার থেকে কালাম সহ লোকজন এসে আমাকে উদ্ধার করে। বাড়ি আনে। বাড়িতে মা-বাবা স্বজনের কান্না দেখে জ্ঞান হারালাম। একদিন পর জ্ঞান আসে। কাটিরহাট এলাকা থেকে শাশুর বাড়িতে আশ্রয় নেয়া এক চিকিৎসক (ধর্মপুর স্কুলের প্রতিষ্টাতা মফজল আহমদ এর মেয়ের জামাতা) বিদেশে ডাক্তারের সহযোগী ব্রাদার্স ইদ্রিস এবং এই এলাকার প্রবীন চিকিৎসক ডা. আনোয়া পাশা বাড়িতে লুকিয়ে লুকিয়ে চিকিৎসা দেন আমাকে। পাক বাহিনীর এবং রাজাকারদের ভয়ে স্থান বদল করে ব্যাপারী পাড়া এবং খিরামে আত্মীয় বাড়িতে রাখা হয় আমাকে। প্রচন্ড গুলির শব্দের উৎসবে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দে বুকের ব্যথা ভুলে যাই। পরদিন বাড়ি ফিরি। মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু শামসুল আলম ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অস্ত্র পাচারের পর বাড়ি ফিরি ১১ জানুয়ারী ১৯৭২।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার যুদ্ধাহত সনদ দেয়ার জন্য আবেদন চেয়েছে। অনেক স্থান ঘুরে সেই সনদ আজো পাইনি। সেই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার চিহ্ন বুকে-পিটে আর সেই ১৫ বছর বয়সের গুলিবিদ্ধ গেঞ্জিটি আজো যত্নে রেখেছি। মাঝে মাঝে বের করে দেখি তখন কি ছিলাম ? জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে প্রবাসী ছিলাম অনেকদিন। দেশে ফিরে আবার সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে কৃষি কাজে লিপ্ত আছি। এক মেয়ে বিবাহিত এবং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। এক ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে, অপর ছেলে অধ্যায়ন করছে।




