এ কালে গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি সাহিত্য সাময়িকী, ক্রীড়া ও চলচ্চিত্র, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নানান বিষয় নিয়ে আমাদের প্রতিদিনের নাস্তার টেবিলে হাজির হয়। গতকালের ঘটে যাওয়া সংবাদও হাজির হয় টেলিভিশনের পর্দায় জীবন্ত হয়ে। এসবের বাইরেও ভ্রমণকাহিনি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, রান্নার টুকিটাকি, স্বাস্থ্যবিষয়ক নানান টিপসসহ বিভিন্ন বিষয়ও নিয়মিত চোখের সামনে উপস্থিত হয় গণমাধ্যমে ভর করে।
এ কথা বললে মোটেও অতিরিক্ত মনে হবে না যে বর্তমান যুগ শাসন করছে অবাধ তথ্যপ্রবাহই। হালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তথ্যের শক্তি সম্পর্কে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বর্তমানে কিছু ভূঁইফোড় গণমাধ্যমের কথা বাদ দিলেও মূলধারার গণমাধ্যমের সংখ্যাও কিন্তু বেড়েছে। এই গণমাধ্যমের প্রসারে কিন্তু সাধারণের কল্যাণই হয়েছে বলতে হবে। গণমাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যকে যাচাই করে নিতে পারছে এর সুফলভোগীরা। তবে এ কথাও সত্য যে বিভিন্ন গণমাধ্যম মালিকদের রয়েছে নিজস্ব ‘হাউস পলিসি’। এই কারণে তাদের উপস্থাপন কৌশলও ভিন্ন ভিন্ন হয়। কিন্তু যতই সত্যকে রঙ মাখিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হোক না কেনো, উনিশ -বিশকে সাত-সতেরো করা এখন প্রায় অসম্ভব। করলেও তা জনগণের চোখকে এড়িয়ে যাওয়া কেবল কঠিনই নয়, বরং অসাধ্যও।
এই যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের ফলে গণমাধ্যম সহজে ও দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে। আবার জনগণের ফিডব্যাকও মিডিয়া সংশ্লিষ্টরা জানতে পারছেন দ্রুত। এসব কারণেই গণমাধ্যমের অতিরিক্ত সতর্ক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। এতসব নানান যৌক্তিক কারণে আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি গণমাধ্যম দিনে দিনে স্বচ্ছতার দিকে যাচ্ছে, যেতে এক রকম বাধ্য হচ্ছে। আজকাল হাতে একটি স্মার্ট ফোন থাকলেই যে কেউ সহজে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। পারছেন নিজের মতামত তুলে ধরতে। আর এই প্রবণতাকে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা ‘মোজো সাংবাদিকতা’ নাম দিয়ে এক প্রকারের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও দিয়েছে ইতোমধ্যে। ফলে সংবাদকর্মীদের আরো চোখকান খোলা রেখে সাংবাদিকতা করতে হচ্ছে। একজন পাঠক অনলাইনে পত্রিকা পড়েও সঙ্গে সঙ্গে নিজের মতামত প্রদান করতে পারছেন অনায়াসে। গঠনমূলক মতামত ও সংবাদ বিশ্লেষণ করাও যাচ্ছে। এতেই গণমাধ্যমের জবাবদিহিতার প্রসঙ্গটি বার বার সামনে চলে আসছে। আর এটিই গণমাধ্যমবিপ্লবের বড় সাফল্য মনে করছেন অনেকে।
বর্তমানে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে মিডিয়ায় আসছেন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তির পাশাপাশি বিশেষায়িত ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা’ বিভাগে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা। এই কারণে গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, বর্তমানে গণমাধ্যমের মধ্যে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া, বিশেষ করে টেলিভিশনে বিনোদন ও সংবাদের তুলনায় রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সে তুলনায় সামাজিক বিষয়গুলো বড় বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। এ কারণে অনেকে টেলিভিশন দেখা থেকে বিরত থাকছেন। এটিকে গণমাধ্যমের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে এড়িয়ে ‘গোষ্ঠী সম্পৃক্ততা’ বা ‘ক্ষমতা সংশ্লিষ্টতা’ বলা যায় কি না মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা বিবেচনা করবেন বলে মনে করি। আবার ব্যবসায়ীদের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ কিংবা মিডিয়া শাসনও আলোচনায় এসে যাওয়া বড় বেশি বিচিত্র নয়।
জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎকর্ষের পর থেকে আরো নির্দিষ্ট করে বললে ছাপাখানা আবিষ্কারের পর থেকেই গণমাধ্যমের প্রভাব-প্রতাপ ছিলো এবং আজ অব্দি সমহিমায়-বহালতবিয়তে রয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে জবাবদিহিতা বা দায়বদ্ধতা কি বেড়েছে? এক কথায় এর উত্তর দেওয়া সহজ নয় গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা কিন্তু এ সমাজের মানুষ। সুতরাং সমাজ নিয়ে তাঁদেরও দায়বদ্ধতা থেকে বিমুক্ত হওয়ার কোন অবকাশ নেই। সেই বিবেচনায় গোষ্ঠী সম্পৃক্ততা বা শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার চেয়ে জনস্বার্থ রক্ষা ও সামাজিক দায়মোচনকে গুরুত্ব দিয়ে জনগণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করাতে তাঁদের আগ্রহের জায়গায় নিয়ে গেলে পাঠক ও দর্শক-শ্রোতাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ মসৃণ হবে বলে বিশ্বাস করি। গণমাধ্যমকে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় নিয়ে আসতে হলে অর্থ নয়, জনস্বার্থের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা ও জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে আরো বেশি ফোকাস করা দরকার। আমরা জানি যে সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ একটি চলমান ইস্যু। অন্যদিকে রাজনৈতিক ঘটনাগুলো একটি শেষ হলে আরেকটি শুরু হয়। কিন্তু সামাজিক ইস্যুর বেলায় তা একেবারেই ব্যতিক্রম। এ কারণে সামাজিক সমস্যাগুলো গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত আলোচনা হওয়া দরকার। সামাজিক জীবনের সমস্যা, সম্ভাবনা, প্রত্যাশা, প্রাপ্তির নির্মোহ প্রতিফলন যেনো গণমাধ্যমে উঠে আসে। সামাজিক বিধিনিষেধের খুঁটিনাটি, নীতি-নৈতিকতাকে এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে সমুন্নত রেখে গণমাধ্যমের আদর্শ নির্ধারণ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি সুযোগ-সুবিধার কথা সাধারণ মানুষের অনেকেই জানেন না। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার সম্পর্কে তাঁরা অনবগত। এই বিষয়গুলো তাঁদের কাছে তুলে ধরাও গণমাধ্যমের সামাজিক দায়বদ্ধতা বলে মনে করি। অনালোকিত সরকারি পরিসেবাগুলো সম্পর্কে জনগণের নিকট তথ্য সরবরাহ করাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে । গণমাধ্যম এখানে জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সূত্র হিসেবে কাজ করতে হবে। আর তা করতে পারলেই সংবাদমাধ্যমগুলোর সাথে জনগণের সেতুবন্ধ তৈরি হতে পারে। আর তা সম্ভব হলেই গণমাধ্যমের ও গণমানুষের আস্থার ভিত সুদৃঢ় হবে বলা যায়।
লেখক : কলেজ শিক্ষক ও মুক্ত সাংবাদিক।



