৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক) ও মাইজাভান্ডারী তরিকা

সোলাইমান আকাশ

১৮০০ শতাব্দীতে বাংলার জমিনে এক তরিকার প্রবর্তন ঘটে। সেই তরিকার নাম মাইজভাণ্ডারী তরিকা। এই তরিকার প্রবর্তক সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক)। উনার জম্মের আগেই স্বপ্ন যোগে বিশ্ব শান্তির দ্রুত হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (দ) উনার পিতা হযরত সৈয়দ মতিউল্লাহ (রঃ) কে স্বপ্নযোগে বলেন, তোমার ঔরসে আমার একজন প্রিয় বন্ধু আসবে, যার নাম রাখবে আহমদ উল্লাহ। ঠিক হুজুর গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী দুনিয়াতে আগমনের পর তার নাম রাখা হয় সৈয়দ আহমদ উল্লাহ। তাই তিনি মাতৃগর্ভ থেকে অলিআল্লাহ। পটভুমি: গাউছুল আজম হযরত মওলানা শাহ্‌ছুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) পিতা হযরত শাহসূফী সৈয়দ মতিউল্লাহ (রহঃ) ও মাতা সৈয়দা খায়েরুন্নেছা বিবি (রহঃ) এর ঔরসে ১৮২৬ সালে , ১২৪৪ হিজরি ,১২৩৩ বাংলা ১লা মাঘ, রোজ বুধবার আওলাদে রসূল(সাঃ) চট্টগ্রাম শহর হতে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে তৎকালীন প্রত্যন্ত মাইজভান্ডার গ্রামে আগমন(জন্ম) করেন। গাউছুল আজম হযরত আহমদ উল্লাহ (কঃ) এর পূর্বপুরুষগণ ছিলেন সৈয়দ অর্থাৎ নবীজির বংশধর। মূলত হযরতের পূর্বপুরুষগন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্য মদিনা শরীফ থেকে বাগদাদ শরীফ ও দিল্লি হয়ে মধ্যযুগীয় বাংলার পূর্ববর্তী রাজধানী গৌড় নগরে চলে আসেন। হযরত আহমদ উল্লাহ (কঃ) প্র-প্রপিতামহ হুজুর গাউছে পাকের আওলাদ হযরত হামিদ উদ্দীন বোগদাদি (রঃ) ছিলেন গৌড়ের নিযুক্ত ইমাম ও কাজী। কিন্তু গৌড় নগরে হঠাৎ মহামারীর প্রকট আকার ধারনের কারণে তিনি পরবর্তীতে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার হামিদ গাঁ নামক এলাকায় চলে আসেন। এলাকাটি তখন উনার নামে নামকরণ হয়েছিল। যা বর্তমানে হাইদগাঁ নামে আছে। হযরত হামিদ উদ্দীন বোগদাদির ছেলে হযরত সৈয়দ আবদুল কাদিরকে তৎ সময়ে ফটিকছড়ির আজিম নগরের ইমাম করা হয়েছিল। তার দুই পুত্র ছিল; সৈয়দ আতাউল্লাহ ও সৈয়দ তৈয়ব উল্লাহ। সৈয়দ তৈয়ব উল্লাহ’র তিন পুত্র ছিল; সৈয়দ আহমদ, সৈয়দ মতিউল্লাহ ও সৈয়দ আবদুল করিম, তন্মধ্যে দ্বিতীয় পুত্র হলেন সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর পিতা।শিক্ষা-দীক্ষা:হযরত আহমদ উল্লাহ (কঃ) গ্রামের মক্তবের পড়ালেখা শেষ করার পর ১২৬০ হিজরীতে উচ্চ শিক্ষার্জনের উদ্দেশ্যে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ১২৬৮ হিজরীতে উচ্চ শিক্ষা শেষ করেন। সেখানেই তিনি তৎকালীন কৃতিত্বের সহিত গোল্ড মেডালিস্ট পেয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানাদিতে আমন্ত্রিত অতিথি বা বক্তা হিসাবে ধর্মীয় প্রচার-প্রচারণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি উনার পীর হযরত সৈয়দ আবু শাহমা মুহাম্মদ সালেহ কাদেরী লাহোরীর কাছ থেকে অধ্যয়ন করার পাশাপাশি আবু শাহমার বড় ভাই সৈয়দ দেলোয়ার আলী পাকবাজ লাহোরীর কাছ থেকেও অধ্যয়ন করেন।

কর্ম জীবন:

তিনি শিক্ষা জীবন শেষে করে হিজরী ১২৬৯ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতের যশোর অঞ্চলের বিচার বিভাগীয় কাজী পদে যোগদান করেন এবং একই সঙ্গে মুন্সেফী অধ্যয়ন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১২৭০ হিজরীতে কাজী পদে ইস্তফা দিয়ে তিনি কলিকাতায় মুন্সী বু আলী মাদ্রাসায় প্রধান মোদাররেছ হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে মুন্সেফী পরীক্ষায় ও তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে ছিলেন।আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা:গাউছুল আজম হযরত কেবলা তার পীরে তরিকত শেখ সৈয়দ আবু শাহমা মুহাম্মদ ছালেহ আল কাদেরী লাহোরী (রহঃ) এর কাছ বায়াত গ্রহণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতা অর্জন করেন। পাশাপাশি তিনি পীরে তরিক্বতের বড় ভাই হযরত সৈয়দ দেলোয়ার আলী পাকবাজ (রহঃ) –এঁর কাছ থেকে কুতুবিয়তের ফয়েজ অর্জন করেন।আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক, হিকমত, বালাগত, উছুল, আকায়েদ, ফিলছফা, ফারায়েজ সহ যাবতীয় বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন। আরবী, উর্দু, বাংলা ও ফারসি ভাষায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। তৎকালীন সময়ে ওয়ায়েজ এবং বক্তা হিসাবে তার খ্যাতি ছিল। অল্প কিছু দিন পরই তিনি আধ্যাত্মিক জীবন যাপনে আত্ম নিয়োগ করেন। তখন হতে তিনি বাকি জীবন একজন সুফি সাধক হিসাবে অতিবাহিত করেন।

ব্যক্তিগত জীবন:

হযরত আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী ১২৭৬ হিজরীতে ৩২ বছর বয়সে আজিম নগর নিবাসী মুন্সী সৈয়দ আফাজ উদ্দিন আহমদের কন্যা সৈয়দা আলফুন্নেছা বিবির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্ত বিয়ের ছয় মাসের মাথায় তার স্ত্রী মারা যান। সেই বছরই তিনি পুনরায় সৈয়দা লুৎফুন্নেছা বিবিকে বিয়ে করেন। ১২৭৮ হিজরী সালে তার প্রথম মেয়ে সৈয়দা বদিউন্নেছা বিবি জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু মেয়েটি চার বছর বয়সে মারা যায়। এরপর তার আরোও একটি ছেলে জন্মগ্রহণ করে অল্প দিনের মধ্যে মারা যান। অতঃপর ১২৮২ হিজরীতে দ্বিতীয় পুত্র সৈয়দ ফয়জুল হক এবং ১২৮৯ হিজরী সালে দ্বিতীয় কন্যা সৈয়দা আনোয়ারুন্নেছা জন্মগ্রহণ করেন। তার দ্বিতীয় পুত্রও পিতার পুর্বে মৃত্যুবরণ করেন।

মাইজভান্ডার শরীফ এর গোড়াপত্তনঃ

হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) তাঁর পীরে ত্বরিকতের নির্দেশে ১৮৫৭ সালে নিজ গ্রাম মাইজভান্ডারে ফিরে আসেন। খোদার রহমতে আধ্যাত্মিক সাধক ও আশেকভক্তের ভীড়ে এই সাধকের পবিত্র বাসভূমি বিশ্ব মানবতার কল্যাণধারক এক উচ্চমার্গীয় আধ্যাত্মিক দরবারে পরিণত হয়। লোকসমাজে পরিচিতি পায় ‘মাইজভান্ডার দরবার শরীফ’ হিসেবে।গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী সম্পর্কে সমসাময়িক ও পরবর্তি ছুফী ওলামায়ে কেরাম তাঁর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা নিবেদন ও তাঁর গাউছে আজমিয়তের স্বীকৃতি দিয়েছেন-“গাউছে মাইজভান্ডারীর নিঃশ্বাসের বরকতে পূর্বদেশীয় লোকেরা খোদা পন্থী ,হাল ও জজ্‌বার অধিকারী হয়েছে। তিনি কবরস্থ হওয়ার ফলে বিভিন্ন কবরে উজ্জ্বলতা ও জালালী দেখা দিয়েছে। আহমদ উল্লাহ যিনি, তিনি সমস্ত অলিদের সর্দার যাহার ‘ছিফত’ উপাধি গাউছুল আজম।”-“হযরত শাহ্‌ আহমদ উল্লাহ কাদেরী,যিনি ভূখন্ডের পূর্বাঞ্চলে বিকশিত কুতুবুল আক্‌তাব। তিনি মাইজভান্ডার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত গাউছুল আজম নামধারী বাদশাহ।–রসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর নিকট বেলায়তে ওজমা বা শ্রেষ্ঠ বেলায়তের দুইটি সম্মান প্রতীক বা তাজ ছিল। এই সম্মান প্রতীক বা তাজ দুইটির মধ্যে একটি হযরত শাহ্‌ আহমদ উল্লাহ (কঃ) এঁর মস্তক মোবারকে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত। অন্যটি বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানীর মস্তক মোবারকে প্রতিষ্ঠিত।যেই কারণে তিনি পূর্বাঞ্চলে আবির্ভূত গাউছুল আজম বলিয়া খ্যাত,সেই কারণে তাঁহার রওজা মোবারক মানব-দানবের জন্য খোদায়ী বরকত হাছেলের উৎসে পরিণত হইয়াছে।

ওফাত বার্ষিকী মহান ১০ মাঘ:

১০ মাঘ, ২৪ জানুয়ারি, মাইজভান্ডার দরবারে এক পবিত্র দিন হিসেবে উদযাপিত হবে। এই দিনটি শুধুমাত্র একটি তারিখ নয়, এটি অলি কুলের শিরোমণি, উপমহাদেশের মাইজভান্ডারি তরিকার প্রবক্তা এবং মহাসাধক হজরত গাউসুল আজম আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারির স্মৃতিকে ধারণ করার এক ঐতিহাসিক দিন। তার পবিত্র জীবন, আধ্যাত্মিক দীক্ষা এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত অবদান অনুপ্রেরণার এক চিরন্তন উৎস। প্রতি বছর এই দিনটি মাইজভান্ডারি তরিকার অনুসারীদের জন্য এক মহিমান্বিত উৎসবে রূপ নেয়। পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত, অনুসারী, এবং আধ্যাত্মিক সাধনার পথপ্রেমীরা সমবেত হন মাইজভান্ডার দরবারে। দরবারের পরিবেশ পূর্ণ হয় এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে, যেখানে একসাথে উচ্চারিত হয় জিকির, দোয়া এবং কৃতজ্ঞতার সুর।

লেখক: সাংবাদিক

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?