৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন

মরিয়া বিএনপি; ঘাম ঝরাচ্ছে জামায়াত, বসে নেই অন্যরা

এস এম আক্কাছ

চট্টগ্রামের আলোচিত দুই থানা ফটিকছড়ি ও ভূজপুর নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন। আধ্যাত্মিক নগরী খ্যাত ‘মাইজভান্ডার’ ও অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন ‘হেফাজত ইসলামের অস্থায়ী কার্যালয়সহ গুরুত্বপুর্ণ বিষয়ে দেশজুড়ে খ্যাতি চট্টগ্রামের বৃহত্তর ফটিকছড়ি উপজেলার। এছাড়াও এশিয়ার বৃহত্তম ‘দাঁতমারা রাবার বাগান’ ও দেশের ১৮টি চা বাগান অবস্থিত এ উপজেলায়।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসনটি বিএনপির ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত। এবার সে ভোট ব্যাংকে জোরালোভাবে ভাগ বসাতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলটি। অন্যদের দৃশ্যমান কার্যক্রম চোখে না পড়লেও কেউ বসে নেই; ভোটারের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন। তারা চাইছেন ভোটও।

২০০৮ সালে নৌকার প্রার্থী এটিএম পেয়ারুল ইসলামকে বিপুলভোটে হারিয়ে এমপি হন ধানের শীর্ষের প্রার্থী মরহুম সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। ২০১৪ থেকে কারসাজির নির্বাচনে বরাবরই জয়ী হয়েছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের অন্যতম শরিক তরিকত ফেডারেশনের প্রার্থী। ২০১৪ সালের একতরফা ভোট, ১৮ সালের রাতের ভোটে এমপি হন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরীকদল তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী। আর ‘২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে’ তরিকতকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এমপি ঘোষণা করা হয় আওয়ামী লীগের খাদিজাতুল আনোয়ার সনিকে। আওয়ামী লীগ পতনের পর নজিবুল বশর ও খাদিজাতুল আনোয়ার সনি দুজনই আত্নগোপনে।

এই নির্বাচনী মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি আর ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিএনপি এই বিশাল ভোট ব্যাংক কাজে লাগাতে মরিয়া হলেও এবার সেখানে ভাগ বসাতে ঘাম ঝরাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলটি। দিন-রাত সমানে তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে ভোটারদের মন জয়ে মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে।

নির্বাচনকে ঘিরে এই আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর। আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. নুরুল আমিন। অন্য ছয় প্রার্থী হলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সৈয়দ সাইফুদ্দিন মাইজভান্ডারী, গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান, ইসলামী আন্দোলনের মো. জুলফিকার আলী মান্নান, জনতার দলের মো. গোলাম নওশের আলী এবং স্বতন্ত্র আহমেদ কবির ও জিন্নাত আকতার।

বিএনপি প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিলের পর থেকে একের পর এক ঋণ খেলাপীর মামলা ও প্রার্থিতা চুড়ান্ত করা নিয়ে বেশ বেকায়দায় ছিলেন। নির্বাচন কমিশন থেকে হাইকোর্ট। আবার হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট করতে করতেই তার অধিক সময় যায়। তবে শেষ পর্যন্ত সব চাপিয়ে তিনি এখন প্রচারণার মাঠে। কিন্তু নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হলেও ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আদালতের আদেশের কাছে। আদালত পরবর্তী ২৮ এপ্রিল তারিখ ধার্য্য রয়েছে।

এসব চাপিয়ে শেষতক সর্বত্র সমর্থন আদায়ে মাঠঘাট চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপির এই ত্যাগী প্রার্থী। প্রচার প্রচারণায় তিনি উপজেলাকে এগিয়ে নিতে এবং সার্বিক উন্নয়নের জন্য তাকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন। একইভাবে জামায়াত নেতৃবৃন্দর কোমর বেঁধে নেমেছেন আসনটি বাগে আনতে। উপজেলার বাসিন্দাদের একান্তই চাওয়া আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, হালদা ও ধুরুং খালের ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা ও গ্যাস সরবারহের মতো বিভিন্ন বিষয়।

বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর বলেন, ‘একটি দল আমাদের আদালতে রেখে ক্ষমতার দিবা স্বপ্ন দেখলেও তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না। হামলা-মামলা যাই হোক ইনশাল্লাহ বিএনপির প্রার্থীর বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। জনগনই আমাদের ক্ষমতার উৎস।’ নির্বাচিত হলে আমি উপজেলার জন্য সর্বক্ষেত্রে নিরলস কাজ করে যাবো।’

উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ওমর ফারুক বলেন, ‘উর্বর এই আসনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয় লাভ করবে আমাদের প্রার্থী। বিজয়ের মাধ্যমে আমরা প্রমান করবো ফটিকছড়িবাসী বরাবরই জিয়ার আদর্শের অনুসারি।’

এদিকে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা জামায়াতে ইসলামী দলটি এবার চায় চমক দেখাতে। তারা নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীসমর্থকদের বাগে আনতে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটিতে বিজয়ের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা মনে করেন নিষিদ্ধ দলেরর ভোটারদের কাছে আনা গেলে জয় তাদের বাধা হবে না। তারা নানা কৌশলে সব শ্রেণির ভোটারদের বাগে আনতে এখন মরিয়া। উপজেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তারা।

জামায়াতের প্রার্থী মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘ভোটাররা অনুকূল পরিবেশ পেলে দাঁড়ি পাল্লা প্রতীকের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। নেতাকর্মীরা এখন অনেক উজ্জিবীত। প্রতিটি কর্মীই আমাদের এক একেকটি পিলার। ভোটের মাঠেই খেলা হবে।’ উপজেলাবাসী যাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমুল পরির্তন, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভুমিকা দেখাবো।’

ফটিকছড়ি উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. নাজিম উদ্দীন ইমু বলেন, ‘জামায়াত একটি পরিশিলীত দল। দিন-রাত গণসংযোগ ও মাঠে ময়দানে আমরা এসব বলছি। নির্বাচনে দলের মার্জিত ও শিক্ষিত প্রার্থী জয়লাভের ব্যাপারে আমরা আশাবাদি।’

অন্যদিকে, মাঠে ঘাটে প্রচার-প্রচারণায় বিক্ষিপ্তভাবে সরব অন্য প্রার্থীও। তারা নিজেদের মনোনিবেশের মধ্যদিয়ে এবং ভোটারদের নিজেদের কাছে ভাগাতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও।

বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সৈয়দ সাইফুদ্দিন মাইজভান্ডারী বলেন, ‘সুন্নিয়ত ও ইসলামী মূল্যবোধ জাগ্রত করতে একতারা’র বিকল্প নেই। তিনি সবাইকে একতারায় ভোট প্রদানের আহবান জানান।’

গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান তানজিম বলেন, ‘নতুনের কেতন উড়ে। দেশ শোষণ বিরোধী নুরুর দল ট্রাক মার্কার বিকল্প কিছুই হতে পারে না। যোগ্য এবং কনিষ্ট প্রার্থী হিসেবে ভোটররা আমাকে চেনেন এবং জানেন। আমি তাদের ভালোবাসায় সিক্ত হতে চাই। চাই কাঙ্খিত ভোটও।’

ইসলামী আন্দোলনের মো. জুলফিকার আলী মান্নান বলেন, ‘ইতিপূর্বে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বরাবরই আমি ছিলাম সামনে। কওমী অঙ্গনে একথা জনশ্রুতি আছে। সুতারাং হাতপাখা সর্বজন বিধিত। তারুণ্যের প্রথম ভোট হোক হাতপাকায়।’

জনতার দলের মো. গোলাম নওশের আলী বলেন, ‘এলাকা সমৃদ্ধ করতে কানাডার নাগরিকত্ব ছেড়েছি। কলমেই হোক ভোটারদের আস্থা।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী আহমেদ কবির বলেন, ‘আইন পেশায় লোকজনের উপকার করছি। ফুটবলের বিজয় নিশ্চিত করে আরো বেশি উপকার করার সুযোগ চাই।’

একমাত্র নারী স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আকতার বলেন,‘পিছিয়ে থাকা নারীরা এখন সমতায়। অধিকার নিশ্চিতে হরিণ মার্কায় ভোট চাই।’

এই আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৮০ হাজার ৭৮৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৫১ হাজার ৯৪২ ও নারী দুই লাখ ২৮ হাজার ৮৪১ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ১ জন। পোস্টাল সাত হাজার ২৫৫ জন ভোটার। ভোট কেন্দ্র ১৪০ টি এবং ৯০০টি ভোট কক্ষে ভোটার ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?