বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি এবং চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের সাবেক এমপি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন ১৩ মে ২০২৬ তারিখে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে সকাল ১০ঃ১৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৩ বছর বয়সে মারা গেছেন । তিনি বিভিন্ন সময়ে সেদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন । ১৯৭২এ বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যেও তিনি অগ্রগণ্য । চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে তিনি সাতবার (প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন । ২৪ শে জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর ওই বছর ২৭ শে অক্টোবর ঢাকার ভাটারা থানা এলাকা থেকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয় । পরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয় । ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট সব মামলায় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সেক্টর ১-র সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন । চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিরোধ সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন । মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হরিনাক্যাম্পে মিরেশ্বরাই, চট্টগ্রাম, ফটিকছড়ি রামগড়, খাগড়াছড়িসহ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধের প্রশিক্ষণে শামিল হয়েছিলেন । চট্টগ্রামে পাক হানাদারদের বাঙালি নিধনের নীল ছক ঠেকাতে তাঁর নেতৃত্বে সাহসী বীর বাঙালি যোদ্ধারা শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে কুমিল্লা থেকে এগিয়ে আসা পাক সেনাদের পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং চট্টগ্রাম শহর ও ক্যান্টনমেন্টের প্রধান এলাকা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন । ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর সেতু ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান । এই সেতুটি ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংযোগস্থল । শুভপুর সেতু ধ্বংসের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন । ২৫ মার্চ রাতে করের হাট বাজারে এক জরুরী সভায় তিনি সেতু ধ্বংসের আহ্বান জানান । এরপর স্থানীয় জনতা পেট্রোল পাম্প থেকে কেরোসিন সংগ্রহ করতে বেরিয়ে যায় । পেট্রোল পাম্পের মালিক একপর্যায়ে কেরোসিন তেল দিতে বাধ্য হন । তখন জনতা সেতুতে কেরোসিন ও বিটুমিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় । ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত বিস্ফোরক না থাকায় আমরা সেতু ধ্বংস করতে পারলাম না । কিন্তু কিছুটা চলাচলের অনুপযোগী করতে পেরেছিলাম ।’
এই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর সঙ্গে এই শুভপুর সেতু দখলের জন্য চার চারবার যুদ্ধ সংঘটিত করা হয়েছিল । শুভপুর সেতুতে পাকবাহিনী বাধা না পেলে চট্টগ্রামের দখল নিয়ে ভয়াবহ গণহত্যা চালাত । তাতে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তথা মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন তাও সম্ভব হত না ।
তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল ।
লেখক: শিক্ষক ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, ত্রিপুরা, ভারত।



