২৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য;

বনের ভেতর বন্দুকের রাজত্ব!

সালাহউদ্দিন জিকু

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির পাহাড়ঘেরা হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের সুজানগর চা বাগান এলাকায় দেশীয় তৈরি একনলা বন্দুক উদ্ধার ও এক শিকারি আটক হওয়ার ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে হাজারীখিল বনাঞ্চলে সক্রিয় বন্যপ্রাণী শিকার ও মাংস পাচার চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সংঘবদ্ধ এসব চক্র সংরক্ষিত বনাঞ্চলে হরিণ, বন্য শুকরসহ বিভিন্ন প্রাণী শিকার করে গোপনে মাংস বিক্রি করছে। একসময় পাখির ডাক ও বন্যপ্রাণীর বিচরণে মুখর থাকা হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এখন রাতের অন্ধকারে শিকারিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। সন্ধ্যার পর পাহাড়ি বনাঞ্চলে অপরিচিত লোকজনের চলাচল, গুলির শব্দ এবং গোপনে মাংস সরবরাহের ঘটনা প্রায় নিয়মিত বলে জানান তাঁরা।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিকার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি সংঘবদ্ধ চক্রের নিয়ন্ত্রিত একটি অবৈধ নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র, বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও বিশেষ জাল ব্যবহার করে বনের গভীরে অভিযান চালানো হয়। পরে শিকার করা প্রাণীর মাংস বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয় গোপনে।

বিশেষ করে বন্য শুকরের মাংস পাহাড়ি অঞ্চলের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মাধ্যমে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চক্রটির সঙ্গে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির নীরব যোগাযোগ থাকায় প্রকাশ্যে অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না।

শনিবার (১৬ মে) রাতে সুজানগর চা বাগান এলাকায় অভিযান চালিয়ে সুমন ওরাঁও (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এ সময় তাঁর কাছ থেকে একটি দেশীয় তৈরি একনলা বন্দুক উদ্ধার করা হয়। অভিযানে অংশ নেন স্থানীয় ইউপি সদস্য করিম মঈনু ও গ্রাম পুলিশ সদস্যরা। পরে রোববার সকালে তাঁকে ভূজপুর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ইউপি সদস্য করিম মঈনু বলেন, প্রবাস গোয়ালা নামে এক ব্যক্তি বন্যপ্রাণী শিকারে বাধা দিলে সুমন ওরাঁও বন্দুক নিয়ে তাঁকে মারতে যান। পরে বিষয়টি পঞ্চায়েত নেতাদের মাধ্যমে জানতে পেরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় অভিযান চালাই। এরপর বন্দুক উদ্ধার করে পুলিশে হস্তান্তর করা হয়।

ভূজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপুল চন্দ্র দে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বন্যপ্রাণী শিকারের উদ্দেশ্যে স্থানীয়ভাবে আগ্নেয়াস্ত্রটি তৈরি করা হয়েছিল। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারেন। তাঁদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এত কাছাকাছি এলাকায় কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র তৈরি, বন্যপ্রাণী শিকার ও মাংস পাচারের মতো কর্মকাণ্ড চলতে পারে। বন বিভাগের নজরদারি ও স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা কতটা কার্যকর, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় পাহাড়ি এলাকায় টহল কার্যত থাকে না বললেই চলে। ফলে শিকারিরা সহজেই বনাঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে। অনেক সময় বনকর্মীদের উপস্থিতি থাকলেও গভীর রাতে অভিযান খুব কম পরিচালিত হয়।

হারুয়ালছড়ি রেঞ্জের কর্মকর্তা শিকদার আতিকুর রহমান বলেন, বন বিভাগের দায়িত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত পাহারা দেওয়া হয়। তবে পাশের চা বাগান এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। চা বাগানের ভেতরে বন বিভাগের সরাসরি পাহারা দেওয়ার সুযোগ সীমিত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মন্জুরুল কিবরিয়া বলেন, হাজারীখিল বনাঞ্চল জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী, পাখি ও উদ্ভিদের আবাস রয়েছে। এ ধরনের এলাকায় বন্দুক উদ্ধারের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এটি বন্যপ্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকির বার্তা বহন করে। তিনি বলেন, লাইসেন্সধারী কারও অস্ত্র বন্যপ্রাণী নিধনে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন অস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু বন্ধ রাখা এবং অবৈধ সব অস্ত্র উদ্ধার করে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?