“অপুত, আঁরে শেষবারের মতো দেখতি চাইলি, তারাতারি আঁয়…” (পুত্র, আমাকে শেষবারের মতো দেখতে চাইলে দ্রুত আসো)— সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আগে বড় ছেলে আরমানকে করা শেষ ফোনকলে এ কথাই বলেছিলেন মো. শাহজাহান। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে বাবা ও ছোট ভাইয়ের নিথর দেহ সড়কে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। হৃদয়বিদারক এ দৃশ্যের সাক্ষী হয় ফটিকছড়ি উপজেলার পাইন্দং ইউনিয়নের আমতল এলাকা।
সোমবার (১ জুন) সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের আমতল এলাকায় দ্রুতগামী একটি বিআরটিসি বাসের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী মো. শাহজাহান (৪৮) ও তাঁর মেজ ছেলে মো. আরিফ নিহত হন।
আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিকেলে বাবা-ছেলের মরদেহ বাড়িতে আনা হলে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাবার মৃত্যুর খবর জানাতে গিয়ে ২০ বছর বয়সী বড় ছেলে আরমান বারবার শেষ ফোনকলের কথাগুলো উচ্চারণ করছিলেন। তাঁর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। একসঙ্গে পিতা ও ভাইকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার।
আরমানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ৯ বছর বয়সী ছোট ভাই আরফাত। বয়স কম হওয়ায় পুরোটা না বুঝলেও বড় ভাইয়ের কান্না আর স্বজনদের আহাজারি দেখে সেও নিথর হয়ে থাকে। মুহূর্তেই পরিবারের দুই প্রিয়জনকে হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় শিশুটি।
নিহত মো. শাহজাহান উপজেলার বৃন্দাবনহাট এলাকার একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজের মেকানিক ছিলেন। তিনি পাইন্দং ইউনিয়নের করবল্লা টিলা মালেক শাহ মসজিদ এলাকার মৃত এজাহার মিয়ার ছেলে। নিহত আরিফ তাঁর মেজ পুত্র।
বিকেলে করবল্লা টিলার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর ভিড়—শেষবারের মতো বাবা-ছেলেকে দেখতে। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বাদ আসর হযরত মালেক শাহ (রহ.) জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, অসুস্থ স্ত্রীর জন্য ওষুধ নিয়ে সকালে গ্যারেজ থেকে বাড়ি ফিরছিলেন শাহজাহান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেজ ছেলে আরিফ। পথে আমতল মাদ্রাসার সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগামী বাস তাদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে এর আগেই বাসের একটি অংশ পুড়ে যায়।
এ ঘটনায় বাসচালককে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে হেফাজতে নেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
মসজিদে যখন জানাজার প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক সেই সময় একই মহাসড়কের মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে আরও একটি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান প্রবাসী যুবক রবিউল হোসেন রবি (২৪)। তিনি উপজেলার লেলাং ইউনিয়নের বাদশা আলী সিকদার বাড়ির নেজাম পাশার ছেলে।
এ ঘটনায় সাজ্জাদ হোসেন (২৩) নামে আরও এক মোটরসাইকেল আরোহী আহত হন। একই দিনে একই সড়কে পরপর দুটি দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও উদ্বেগ আরও গভীর হয়ে ওঠে।



