সম্পাদকীয়

সড়কে এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন

এস এম আক্কাছ

মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মানে আপনাকে-আমাকে মরতে হবেই। পৃথিবীর মায়া ছিন্ন করে চলে যেতে হবে সবাইকে। এটাই নিয়তি! কিন্তু গত কয়েকদিনে ফটিকছড়িতে একাধিক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অকালেই ঝরেছে কতেক তাজা প্রাণ। এই প্রাণগুলো শুধু যে অকালে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো, তাই নয়। সেই সঙ্গে আজীবনের জন্য শূন্যতা রেখে গেলো তাদের পরিবার-স্বজন-বন্ধুমহলে, এভাবে কত বাবা-মাই তাদের সন্তানকে অসময়ে হারিয়ে দিশেহারা। যেখানে যেকোনো প্রাণেরই মূল্য অপরিসীম, সেখানে তাদের এভাবে চলে যাওয়া আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি। 

প্রকাশিত সংবাদের বরাতে দেখা গেছে, গেল তিনদিনে ফটিকছড়িতে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ ব্যক্তি। শনিবার মিনি কাশ্মীর নামক এলাকায় ভ্রমণে গিয়ে দুই বন্ধু প্রাণ হারান হারুয়ালছড়িতে। একদিন পর সোমবার চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের পাইন্দং এলাকায় প্রাণ হারান বাবা-ছেলে। একইদিন মানিকছড়ি থেকে ফেরার পথে নয়াবাজার এলাকায় প্রাণ হারান এক মোটরসাইকেল আরোহী। আহত হয়েছেন আরও একজন। এর আরোও আগে সড়কে বহু প্রাণ ঝরলেও কার্যকর কোনো প্রতিকার দেখা যায়নি। এই তিন দুর্ঘটনায় যে পাঁচ মানবসম্পদের ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য কতো তার হিসাব কারো জানা নেই। থাকার কথাও নয়। তবুও আমরা কেমন যেন নীরব, নিশ্চুপ ও নির্লিপ্ত। এভাবে আর কত প্রাণ গেলে আমরা প্রাণের মূল্য বুঝতে পারব?

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন অনেকবার বেগবান হতে দেখেছি এবং শুনেছি। সরকারও নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করার কথা বেশ ফলাও করে প্রচার করে চলেছেন। কিন্তু এত বেশি দুর্ঘটনার কারণ কী এবং সড়ক দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কী করণীয় এমন আলোচনা নানা ফোরামে আলোচনা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার হার এবং সড়কের নানা অনিয়ম কমার চেয়ে বরং বর্তমানে বহুলাংশে বেড়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে সবার নতুন করে ভাবতে হবে, ভাবাতে হবে। অনেকেই মনে করেন, আইনের যথাযথ এবং কঠোর প্রয়োগ হলেই প্রকৃতপক্ষে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে। বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক। আবার আঞ্চলিক হাইওয়ে সড়ক চারলেনে উন্নীত করে ডিভাইডারের দাবীও অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবে এই মহাসড়কে যত্রতত্র স্পীড ব্রেকার বসানো কতটা যৌক্তিক তাও ভেবে দেখা দরকার। এসব নিয়ে চুলছেরা বিশ্লেষণ ও টেবিল টক প্রয়োজন।

আমরা মনে করি, এসব দুর্ঘটনার জন্য রাষ্ট্রকে দায় নিয়ে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। অপরদিকে নাগরিক হিসেবে আমাকে-আপনাকে আরোও সচেতন হতে হবে। কারণ, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অবহেলা বা বিশৃঙ্খলা দেখলেই প্রতিবাদ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে হবে সবার আগে।

এই তিনদিনের মর্মান্তিক উপলব্দি থেকে উপজেলাবাসীর প্রত্যাশা, সরকার, হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশের সব ভালো উদ্যোগ, আইন সফল ও কঠোরভাবে পালন হোক। কিন্তু পথচলতি মানুষ হিসেবে আমরা যদি ‘সু-নাগরিক’ হয়ে উঠতে না পারি তা হলে সরকারের কোনো আইন ও ট্রাফিক পুলিশের যে কোনো ভালো উদ্যোগ সুফল বয়ে আনবে না। তবে দিনশেষে সড়কে শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে মৃত্যুর এই মিছিল থামাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে আমাদের পাশাপাশি সরকারকেই। সড়কে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে বড়ই কঠিন।

পরিশেষে আমরা আশায় বুক বাঁধি; এখন থেকে উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল সড়কে যেন কোনো সড়ক দুর্ঘটনা আর দেখতে না হয়। মৃত্যুর সংখ্যা শূণ্যে নেমে আসুক। মৃত্যুকে যেন আর দাম দিয়ে কিনতে না হয়! এজন্য সরকার ও জনগণ সজাগ হোক। কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা বা কাঠামো গড়ে তুলুক সরকার; পাহাড়-সমতলের বৃহৎ জনগোষ্টীর এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সম্পাদক, ফটিকছড়ি প্রতিদিন।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?