আজ ২ জুন। ফটিকছড়ির বিনাজুড়ি খাল গণহত্যা দিবস। এই গণহত্যায় নিহত শহীদরা স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। গণহত্যার স্থানটিও পড়ে আছে অযত্ন ও অবহেলায়।
২০০০ সালে ‘আজকের প্রজন্ম’ কর্তৃক প্রকাশিত প্রজন্ম ম্যাগাজিনে প্রয়াত ভাষাসৈনিক এমদাদুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছিলেন “মুক্তির সোপানতলে দু’টি বিদগ্ধ প্রাণ”। সেই দুটি প্রাণের একটি নানুপুর ইউনিয়ন পরিষদের জননন্দিত চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নুর আহমদ এবং অপরটি বামপন্থী রাজনীতির ধারক, মির্জা আবু অ্যান্ড কোং-এর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ম্যানেজার হিরেন্দ্র কান্তি দত্ত (এইচ. কে. দত্ত)।

বিনাজুড়ি খাল হত্যাকাণ্ড
১৯৭১ সালের এপ্রিল ও মে মাসে মির্জা আবু পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। নানুপুর স্কুলের লঙ্গরখানা ও আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা ও তদারকির দায়িত্বও তিনি পালন করছিলেন। ২ জুন ১৯৭১ ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নানুপুর ও মাইজভান্ডার আমতলী এলাকা ঘিরে ফেলে এবং মির্জা বাড়িতে হামলা চালায়।
হামলার আভাস পেয়ে মির্জা আবু পরিবারসহ বাড়ির পেছন দিক দিয়ে সরে যেতে সক্ষম হন। তাঁর বড় ছেলে মির্জা মহসিন কৃষকের ছদ্মবেশে হানাদার বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যান। তবে মির্জা বাড়িতে অবস্থানরত পরিবারের চল্লিশ বছরের বিশ্বস্ত ম্যানেজার এইচ. কে. দত্তকে ধরে নিয়ে বিনাজুড়ি খালের পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়। একই সময় হানাদার বাহিনী মির্জা আবুর ভেতরের বাড়িতে গানপাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা মির্জা মনসুরের ছোট ভাই মির্জা আকবর ও তাঁর ফুফুকেও আটক করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেদিন হানাদার বাহিনী মির্জা আবুর বাড়ির সামনের মাঠে নানুপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান বি.টি., আহমদ ছফা মাস্টার, ইউনিয়ন কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান মাস্টার ফজলুর রহমানসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষকে একত্র করে আটক রাখে। একপর্যায়ে হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা করে প্রখর রোদে দাঁড় করিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বিশেষভাবে বেদম প্রহার করা হয়।
এ ছাড়া নানুপুর স্কুল মাঠ, সৈয়দপাড়ার দারোগা বাড়ির উঠান এবং অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লিডার আফাজুর রহমানের বাড়ির সামনের স্থানেও আশপাশের বহু মানুষকে ধরে এনে আটক রাখা হয়।
মাইজভান্ডার ও নানুপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে পুরুষ, নারী ও শিশুসহ অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে আমতলী প্রাইমারি স্কুলে আটক রাখা হয়। সেখানে তাদের ওপর নানা ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন ও মারধর চালানো হয়। অন্যদিকে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলহাজ নুর আহমদকে বাড়িতে না পেয়ে তাঁর বৃদ্ধ পিতা ও স্ত্রীকে ধরে এনে আমতলী গার্লস স্কুলে আটক রাখা হয়।
নানুপুর ইউনিয়নে হানাদার বাহিনীর অভিযান এবং তাঁর পিতা, স্ত্রী ও এলাকার নিরীহ মানুষদের আটকের খবর পেয়ে নুর আহমদ শহর থেকে রাউজান হয়ে গ্রামে ছুটে আসেন। নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও তিনি বাবা-স্ত্রী ও এলাকাবাসীকে রক্ষা করাকে নিজের পবিত্র দায়িত্ব মনে করেছিলেন। তিনি ভীত হননি; বরং হানাদার বাহিনীর কাছে মাথা নত করাকে লজ্জাজনক ও গ্লানিকর বলে মনে করেছিলেন। অসীম সাহসিকতার সঙ্গে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
হানাদার বাহিনীর সঙ্গে আলোচনার পর তিনি তাঁর পিতা, স্ত্রী এবং আটক এলাকাবাসীর মুক্তি নিশ্চিত করেন। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাঁর কাছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামের তালিকা দাবি করে। এমনকি তাঁর ইউনিয়নে কেন শান্তি কমিটি গঠন করা হয়নি, তারও কৈফিয়ত চাওয়া হয়। কিন্তু স্বাধীনতাকামী দৃঢ়চেতা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলহাজ নুর আহমদ কোনো নেতাকর্মীর নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, একপর্যায়ে তাঁকে হানাদার বাহিনীর গাড়িতে করে বিনাজুড়ির পশ্চিম দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আবার ফিরিয়ে এনে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। কিছু দূর যাওয়ার পর তাঁকে পুনরায় ডেকে নিয়ে বিনাজুড়ি খালের সেতুর পূর্ব পাশে একটি বাঁশঝাড়ের নিচে গুলি করা হয়। পরে বেয়নেটের আঘাতে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে হানাদার বাহিনী নাজিরহাট ক্যাম্পে ফিরে যায়।

অবহেলায় ইতিহাস
ফটিকছড়ির বিনাজুড়ি খাল গণহত্যা দিবসটি কোনো আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় না। ফটিকছড়ির নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই গণহত্যার ইতিহাস সম্পর্কে জানে না। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উদাসীনতা নিয়ে সচেতন মহলে ক্ষোভ রয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডে নিহত এইচ. কে. দত্তের পুত্র প্রকৌশলী প্রদীপ দত্ত জানান, ১৯৭১ সালের ২ জুন আমি বুয়েটের ছাত্র ছিলাম। বাবার সঙ্গে আমরাও সেখানে অবস্থান করছিলাম। সারাদিন পাকবাহিনী মির্জা আবুর বাড়িতে আমাদের আটক রেখে নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা করা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে অনেককে গণপিটুনি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তখন মির্জা আবু পরিবারের নারী ও শিশুদের সঙ্গে আমার মাও নিরাপদ স্থানে চলে যান।
সন্ধ্যার পর খবর পাই, বাবা এবং চেয়ারম্যান নুর আহমদকে বিনাজুড়ি খালের পাড়ে হত্যা করা হয়েছে। আমরা সেখানে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে খালের পাড়েই বাবাকে সমাহিত করি। চেয়ারম্যান সাহেবকে তাঁর বাড়িতে দাফন করা হয়। আমরা আজও শহীদ পরিবারের মর্যাদা পাইনি। বধ্যভূমির স্থানে ‘বি’ ক্যাটাগরির স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করছে জেনে আমরা আনন্দিত।



