বিশ্ব সাইকেল দিবস

উচ্চ হর্নে হারিয়ে যাচ্ছে সাইকেলের ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ বিশ্ব সাইকেল দিবস। দিনটি শুধু সাইকেলের উদ্‌যাপন নয়, বরং মনে করিয়ে দেয়, এক সময় মানুষ চলাফেরা করত তাদের পায়ের ছন্দে। সেই সময়ে যাতায়াতের প্রিয় সঙ্গী ছিল সাইকেল।


সময়ের চাকা ঘুরেছে। মেঠোপথের জায়গায় এসেছে প্রশস্ত সড়ক। সাইকেলের সংখ্যা কমে গেছে, আর তার পরিবর্তে বেড়েছে মোটরচালিত যানবাহন। সেই কোমল ‘ক্রিং ক্রিং’-কে এখন ঢাকা দিয়েছে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির কর্কশ হর্ন। শহর তো বটেই, অনেক গ্রামেও আজ আর সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ সহজে শোনা যায় না।
অতীতে গ্রামবাংলার চিরচেনা ছবিতে বাইসাইকেল ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ডাকপিয়ন, শিক্ষক, কৃষি কর্মকর্তা, এমনকি চিকিৎসকরাও নিয়মিত সাইকেল ব্যবহার করতেন। এক সাইকেল ছিল অনেক পরিবারের জন্য মর্যাদা ও প্রয়োজনের প্রতীক। তখন রাস্তায় যানবাহনের চাপ কম ছিল, মানুষ তাড়াহুড়ো করত না। সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ ছিল পথের ভাষা। সেই শব্দে বিরক্তির বদলে ছিল সহমর্মিতা।


অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চলাচলের ধরনও বদলেছে। দ্রুতগতির জীবনে সময় বাঁচানো এখন প্রধান বিবেচ্য। ফলে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার এবং অন্যান্য যান্ত্রিক যানবাহনের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। সঙ্গে বেড়েছে শব্দদূষণও। শহরের ব্যস্ত সড়কে দাঁড়ালে একটানা হর্নের শব্দে কথাবার্তাও শোনা যায় না। সেই শব্দের ভিড়ে সাইকেলের ছোট্ট ঘণ্টি যেন অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নগর পরিবহনব্যবস্থায় সাইকেলকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় এর ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়েছে। নিরাপদ সাইকেল লেনের অভাব এবং দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না পারাও এর অন্যতম কারণ।


সাইকেল শুধু একটি বাহন নয়; এটি সামাজিক সংস্কৃতিরও অংশ। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল চালানো, গ্রামের হাটে যাওয়া, স্কুলে যাওয়ার পথে ঘণ্টি বাজিয়ে বন্ধুকে ডাক—এসব স্মৃতি বহু মানুষের শৈশব ও কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকের প্রজন্ম সেই অভিজ্ঞতা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের দৈনন্দিন জীবনে সাইকেলের জায়গা নিয়েছে মোটরচালিত যান। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে সাইকেলকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধনও।


তবু, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানিসংকট এবং নগর যানজটের কারণে আবারও সাইকেলের গুরুত্ব বাড়ছে। অনেক দেশ সাইকেলবান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। স্বাস্থ্যসচেতন তরুণদের মধ্যেও সাইকেল চালানোর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। দেশে বিভিন্ন সাইক্লিং সংগঠন এবং তরুণদের উদ্যোগে সাইকেলের প্রতি আগ্রহ নতুন করে তৈরি হয়েছে। ছুটির দিনে রাজধানীর সড়ক বা জেলা শহরগুলোতে সাইকেল আরোহীদের দল আগের চেয়ে বেশি চোখে পড়ছে।


হয়তো আগের দিনের মতো সাইকেল আর কখনো পথের একচ্ছত্র বাহন হবে না। কিন্তু পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যকর পরিবহনের কথা যখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে, তখন সাইকেলের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে সামনে আসছে। যান্ত্রিকতার উচ্চ হর্নে আজ সাইকেলের ‘ক্রিং ক্রিং’ অনেকটাই চাপা পড়েছে। তবু সেই শব্দ পুরোপুরি হারায়নি। শহরের কোনো ভোরে, গ্রামের কোনো নির্জন পথে কিংবা স্কুলগামী শিশুর সাইকেলে এখনো মাঝে মাঝে শোনা যায় সেই পরিচিত সুর।


সেই ‘ক্রিং ক্রিং’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গতি যতই বাড়ুক, জীবনের সব সৌন্দর্য উচ্চ শব্দে নয়। কিছু সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে ছোট্ট একটি ঘণ্টির মৃদু ধ্বনিতেও।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?