আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস

ফটিকছড়িতে দখল-ভরাট-উজাড় আর কর্তনে বিনাশ পরিবেশ

সালাহউদ্দিন জিকু

গত দেড় বছরে নির্বিচারে কর্তন করা হয়েছে শতাধিক পাহাড়-টিলা।

বিস্তীর্ণ সবুজায়নে ফটিকছড়ি উপজেলাবাসীর ভোর একসময় শুরু হতো পাহাড়ি পাখির ডাক, ছড়ার কলকল ধ্বনি আর হালদার স্রোতের শব্দে। সবুজ পাহাড়, ঘন বনভূমি, অসংখ্য খাল-ছড়া ও দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী মিলে এই জনপদকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। কিন্তু সেই প্রকৃতি আজ নানা সংকটে জর্জরিত। কোথাও নদীর বুকে ফেলা হচ্ছে বর্জ্য, কোথাও দখল হচ্ছে খাল। পাহাড় কেটে বিক্রি হচ্ছে মাটি, কমছে বনভূমি। ভরাটে হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও জলাশয়। ফলে একের পর এক আঘাতে বিপন্ন হচ্ছে ফটিকছড়ির সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা।

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রশ্ন উঠছে- প্রকৃতির এত ক্ষয়ক্ষতির পরও কি আমরা শিক্ষা নিচ্ছি?

হালদা: সম্পদ না দায়?

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী শুধু চট্টগ্রাম বা ফটিকছড়ির নয়, এটি বাংলাদেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বের বিরল কয়েকটি নদীর মধ্যে এটি অন্যতম, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ কার্পজাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে। তাই হালদা নদী একটি অনন্য জীববৈচিত্র্যভিত্তিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা।

কিন্তু বছরের পর বছর দূষণ ও দখলের চাপে হালদার অস্তিত্বই আজ হুমকির মুখে। বিভিন্ন বাজার, পৌর এলাকা ও বসতঘর থেকে বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। কোথাও নদীতীরে জমছে আবর্জনার স্তূপ, কোথাও গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র।

হালদা গবেষক ও বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদা শুধু একটি নদী নয়, এটি দেশের জাতীয় সম্পদ। এই নদী রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারাবে একটি অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।

প্রশ্ন রয়েছে, হালদা কি এখনো আমাদের সম্পদ, নাকি অবহেলা ও দূষণের কারণে ধীরে ধীরে দায়ে পরিণত হচ্ছে?

হারিয়ে যাচ্ছে খাল ও ছড়া:

হালদা নদীর প্রাণ আসে পাহাড়ি খাল-ছড়া থেকে। বর্ষার পানি, পাহাড়ি ঢল ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বয়ে এনে এসব খাল-ছড়াই হালদাকে জীবন্ত রাখে। কিন্তু দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে সেই জলপথগুলোর অনেকগুলোই আজ সংকুচিত, ভরাট কিংবা বিলীন হওয়ার পথে।

২০২৫ সালে ফটিকছড়ির বারোমাসিয়া খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় কয়েক শত কৃষক সেচসংকটে পড়েছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, হালদাভ্যালী চা বাগান কর্তৃপক্ষ খালের স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করায় কৃষি ও পরিবেশ—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সমস্যাটির সমাধান হয়।

একইভাবে, ভূজপুরের বাঁশনালীয়া খাল ও নাজিরহাটের মরা ধুরুং খালও আজ অস্তিত্ব সংকটে। একসময় স্থানীয় কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পানি নিষ্কাশন ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল খাল দুটি। কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধ দখল, বর্জ্য নিক্ষেপ, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ এবং পলি জমার কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও খালের প্রস্থ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও হারিয়ে গেছে জলধারার চিহ্নই। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি, আর নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যকর নজরদারি ও সংরক্ষণ উদ্যোগের অভাবেই খালগুলোর এই করুণ পরিণতি। পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত দখলমুক্তকরণ, পুনঃখনন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা না নিলে এসব ঐতিহ্যবাহী জলপথ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু স্মৃতিতেই রয়ে যাবে।

একসময় যে খাল ও ছড়াগুলো বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত, সেচের পানি সরবরাহ করত এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখত, সেগুলোর অনেকটাই এখন মৃতপ্রায়। ফলে একদিকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট। উভয় সংকটই তীব্র হয়ে উঠছে।

ভরাট হচ্ছে পুকুর ও জলাশয়:

এখানে দিন দিন কমছে পুকুর, ডোবা ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংখ্যা এবং কৃষিজমি। একসময় এসব জলাশয় বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। তবে বর্তমানে বসতি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের চাপ বাড়ায় অনেক জলাশয় ও আবাদি জমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূজপুর কাজিরহাট বাজারের প্রবেশমুখে শতবর্ষী একটি পুকুর ভরাট করে সেখানে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পুকুরটি হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন চৌধুরীর বড় ভাই দিদারুল আলম চৌধুরীর মালিকানাধীন। এছাড়া চট্টগ্রাম–খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে জুবলী স্কুলসংলগ্ন এলাকায় আরও একটি শতবর্ষী পুকুরে মাটি ফেলে ভরাট কার্যক্রম চলছে। জনশ্রুতি আছে, পুকুরটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিয়মিত ব্যবহার্য। রাজনৈতিক প্রভাবে এটি দখল করে ভরাট চলছে।

ভরাট করা অংশে অস্থায়ী দোকানও নির্মাণ করা হয়েছে। সচেতনদের মতে, জলাশয় কমে যাওয়ায় জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ বাড়ছে এবং কৃষিজমি কমে খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এতে স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ফটিকছড়ি পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মো. সোলাইমান আকাশ বলেন, প্রাকৃতিক জলাধার, কৃষিজমি ও জলপ্রবাহ রক্ষা না করলে ভবিষ্যতে পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকিতে পড়বে। উন্নয়নের নামে অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পাহাড় কাটার নীরব বিপর্যয়:

পাহাড় ভূ-প্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাহাড় ও টিলাগুলো শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়, বরং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধারণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে উন্নয়ন, আবাসন নির্মাণ, ইটভাটা ও মাটি ব্যবসার কারণে বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটার ঘটনা বেড়েছে।

একসময় সবুজ বনানীতে আচ্ছাদিত অনেক পাহাড় এখন আকার হারিয়েছে। কোথাও পাহাড় কেটে সমতল, কোথাও আবার ট্রাকে করে মাটি বিক্রি করা হয়েছে। ফলে ধ্বংস হচ্ছে গাছপালা, কমে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ বলেন, ‘টিলা-পাহাড় কর্তন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মারাত্মক হুমকি। এসব অব্যাহত থাকলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে, কমবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রশাসনের নানাবিধ অভিযানের পরও অনেক ক্ষেত্রে পাহাড় কাটা বন্ধ হয়না। পরিবেশ রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পাহাড়কে প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন সচেতনরা।

বনভূমির ওপর বাড়ছে চাপ:

পাহাড়ঘেরা এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। প্রায় ৩ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি নিয়ে গড়ে ওঠা এই সংরক্ষিত এলাকা বনরুই, অজগর, বুনো বিড়াল, গেছো বাঘ, খেকশিয়ালসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। তবে ফটিকছড়ির বন ব্যবস্থাপনা কাঠামো অনুযায়ী পুরো বনাঞ্চলটি ৫টি বন রেঞ্জ ও ১৫টি বনবিটের আওতায় পরিচালিত হয়, যার মধ্যে সংরক্ষিত এলাকা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকলেও অন্যান্য বনাঞ্চলে চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

বন দখল, অবৈধভাবে গাছ কাটা, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং বনভূমিকে অন্য কাজে ব্যবহারের কারণে এ বনাঞ্চল ক্রমেই চাপে পড়ছে। বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র মতে, বিভিন্ন সময়ে অভয়ারণ্যের ভেতরে অনুপ্রবেশ, বন্যপ্রাণী শিকার এবং শিকারে ব্যবহৃত দেশীয় বন্দুক উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি এক পাহাড়ি এলাকায় বন্যপ্রাণী শিকারে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসে, যা বনাঞ্চলে অবৈধ শিকারের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি কমে গেলে শুধু গাছ হারায় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো বাস্তুতন্ত্র। বন্যপ্রাণীর আবাস সংকুচিত হয়, কমে যায় বৃষ্টির পানি ধারণের সক্ষমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও প্রকট হয়। পরিবেশ রক্ষায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে দখল ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি বনবিট ও রেঞ্জ পর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি সচেতন মহল।

পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন:

নদী, খাল, পাহাড়, বন ও জলাশয়—এগুলো আলাদা কোনো বিষয় নয়। একটির ক্ষতি অন্যটিকে প্রভাবিত করে। পাহাড় কাটা হলে পলি গিয়ে পড়ে নদীতে। বন উজাড় হলে কমে পানি ধারণক্ষমতা। খাল ভরাট হলে বাড়ে জলাবদ্ধতা। নদী দূষিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাছের প্রজনন। অর্থাৎ প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান একটি অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। ফটিকছড়ির ক্ষেত্রে সেই সুতো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

হালদা নদীকে দূষণমুক্ত রাখা, খাল-ছড়া পুনরুদ্ধার, পাহাড় কাটা বন্ধ, বনভূমি রক্ষা এবং জলাশয় সংরক্ষণ। এসবকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে নয়, একটি সমন্বিত পরিবেশ রক্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। মানুষ একসময় চিনত হালদা, পাহাড় আর সবুজ বনভূমির জনপদ হিসেবে, আগামী প্রজন্মের কাছে সেই পরিচয় হয়তো কেবল পুরোনো সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা স্মৃতির অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মতামত:

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। নদী-খাল দখল, পুকুর ভরাট, পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণে আইনগত ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং যেসব স্থানে অবৈধ দখল বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে সেগুলো চিহ্নিত করে উচ্ছেদ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সামাজিকভাবে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি যায়।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?