মুঠোফোনের ক্যামেরা তাক করতেই যেন চোখের সামনে খুলে যায় সবুজের এক স্বপ্নরাজ্য। দিগন্ত ছুঁয়ে যাওয়া পিচঢালা সড়ক, দুই পাশে সারি সারি রাবারগাছ, আর মাথার ওপর সবুজ পাতার ঘন ছাউনি। পাতার ফাঁক গলে আসা সূর্যের আলো সড়কের বুকে এঁকে দেয় আলো-ছায়ার অপূর্ব কারুকাজ। মুহূর্তেই মনে হয়, যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই অপার্থিব সৌন্দর্যই ভ্রমণপিপাসুদের মুখে মুখে জায়গাটির নাম করে দিয়েছে—‘সেলফি রোড’।
চট্টগ্রামের নবগঠিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের হেঁয়াকো বাজারসংলগ্ন এই সড়কটি সরকারি কোনো পর্যটন কেন্দ্র নয়। নেই টিকিট কাউন্টার, বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র কিংবা আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো। তবু প্রকৃতির নিজস্ব সৌন্দর্যই প্রতিদিন টেনে আনছে শত শত দর্শনার্থীকে। তরুণ-তরুণী, পরিবার, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এটি এখন এক প্রিয় গন্তব্য।
হেঁয়াকো জিসি থেকে সিকদারখিল পর্যন্ত এলজিইডির আওতাধীন প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি নির্মিত হয় ২০১৩–১৪ অর্থবছরে। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ রাবার বাগানের প্রায় দুই লাখ ১১ হাজার রাবারগাছের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া পথটি আজ শুধু একটি যোগাযোগ সড়ক নয়; বরং প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য প্রতীক।
একসময় স্থানীয়দের কাছে এটি ছিল কেবল ‘নতুন সড়ক’। প্রতিদিন মানুষ চলাচল করলেও এর সৌন্দর্য তেমন আলোচনায় আসেনি। করোনা মহামারির সময় মানুষ যখন খোলা প্রকৃতির খোঁজে বের হতে শুরু করে, তখন দর্শনার্থীদের তোলা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের মাধ্যমে অচেনা এই পথ পরিচিতি পায় দেশজুড়ে। এরপর থেকেই লোকমুখে এর নাম হয়ে যায় ‘সেলফি রোড’।
সকালের কোমল আলো কিংবা বিকেলের সোনালি রোদ—দুই সময়েই সড়কটির সৌন্দর্য ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। কেউ মোটরসাইকেল থামিয়ে ছবি তুলছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে হাঁটছেন, আবার কেউ ভিডিও ধারণে ব্যস্ত। সবুজে মোড়া এই পথ যেন প্রতিটি ছবিকেই করে তোলে আরও জীবন্ত।

খাগড়াছড়ির রামগড়ে ফেনী নদীর ওপর বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী সেতু চালু হওয়ার পর সেলফি রোডে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। মৈত্রী সেতু, আশপাশের চা-বাগান এবং সেলফি রোড—এক সফরেই তিনটি ভিন্ন সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ থাকায় এটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ভ্রমণপথে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঈদসহ বিভিন্ন ছুটির দিনে এখানে মানুষের ঢল নামে। বিকেলের দিকে সড়কটি যেন ছোট্ট এক মিলনমেলায় রূপ নেয়। হাসি-আড্ডা, ক্যামেরার ক্লিক আর সবুজের স্নিগ্ধতায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
প্রকৃতির নীরবতা, সবুজের শীতল পরশ আর নির্মল বাতাস—সব মিলিয়ে ফটিকছড়ির ‘সেলফি রোড’ এখন শুধু একটি সড়কের নাম নয়; এটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনুভূতির নাম। নগরজীবনের কোলাহল থেকে কিছুটা সময় দূরে থেকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিজেকে খুঁজে নেওয়ার এক নির্মল ঠিকানা।
পরিকল্পিতভাবে বিশ্রামাগার, বসার স্থান, পার্কিং, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই সড়ক ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
যেভাবে আসবেন
চট্টগ্রাম শহর থেকে অক্সিজেন–হাটহাজারী হয়ে বাস, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে সহজেই ফটিকছড়ির হেঁয়াকো বাজারে পৌঁছানো যায়। এছাড়া ফেনী–খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক ব্যবহার করেও এখানে আসা সম্ভব।
হেঁয়াকো বাজার থেকে অল্প দূরেই দাঁতমারা ইউনিয়নের হেঁয়াকো জিসি–সিকদারখিল সড়ক, যা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ‘সেলফি রোড’ নামে পরিচিত।
খাগড়াছড়ির রামগড় বা বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী সেতু ভ্রমণে এলে সেখান থেকেও সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। ফলে এক সফরেই মৈত্রী সেতু, চা-বাগান ও সেলফি রোডের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব।
ভ্রমণের জন্য সকাল বা বিকেল সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখতে রাবারগাছের কোনো ক্ষতি না করা, প্লাস্টিক বা অন্যান্য বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলা এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।



