প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ কভার:

মাঠের সাংবাদিকতা বনাম প্রেসকার্ডের দাপট!

ওবাইদুল আকবর রুবেল

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফটিকছড়ি সফর উপলক্ষে গত ১ আগস্ট থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীরা। সময়ের সাথে সাথে বাড়ে ব্যস্থতাও। আর সেই ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে সংবাদকর্মীদের দৌড়ঝাঁপও।

এক দৌড়ে পেলাগাজী দিঘির সিএন্ডবি মাঠ, আরেক দৌড়ে বাবুনগর মাদ্রাসা। কোথাও প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে প্রস্তুতির খবর, কোথাও নিরাপত্তাব্যবস্থা, আবার কোথাও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্য ও কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছুটে চলাই যেন হয়ে ওঠে প্রতিদিনের রুটিন। 

এর মধ্যেই কখনো বৃষ্টি, কখনো প্রখর রোদ। ভিজে, ঘেমে কিংবা ক্লান্ত শরীরে ছুটতে হয়েছে খবরের পেছনে। সঙ্গে ছিল অফিসের ডেডলাইন ও ‘প্যারা’,। সময়মতো নিউজ পাঠানোর চাপ, ব্রেকিংয়ের জন্য অপেক্ষা, ছবি-ভিডিও সংগ্রহ এবং প্রতিটি তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত করার ব্যস্ততা।

তবে সবকিছুর ওপরে ছিল দায়িত্বশীলতার জায়গাটি। প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে জাতীয় পর্যায়ের খবরের পাশাপাশি ফটিকছড়ির মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া, এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরতে হয়েছে। কারণ স্থানীয় সাংবাদিকতার বড় দায়িত্বই হলো নিজের এলাকার মানুষের কথাগুলো যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।

বৈঠক ঘিরে বাড়তি কৌতূহল!

সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল সরকারপ্রধানের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের আমিরের বৈঠক। বৈঠকটি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিল ব্যাপক আগ্রহ। ফলে সংবাদকর্মীদের ওপরও তৈরি হয় বাড়তি চাপ।

অফিস থেকে বারবার জানতে চাওয়া হচ্ছিল- 

বৈঠকে কারা থাকছেন? হেফাজতের পক্ষ থেকে কী কী প্রস্তাব দেওয়া হবে? আলোচনায় কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে? 

আলোচ্য প্রশ্ন ছিল- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও হেফাজতে ইসলামের আমিরের মধ্যে কী কথা হবে?

বৈঠকের আগে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ছুটতে হয়েছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা, অংশগ্রহণকারীদের তালিকা সংগ্রহ, প্রস্তাবের বিষয়ে তথ্য নেওয়া এবং শেষ মুহূর্তের আপডেট নিশ্চিত করা- সবকিছুর মধ্যেই চলছিল এক ধরনের অদৃশ্য দৌড়।

কারণ সাংবাদিকতার মাঠে শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকাই যথেষ্ট নয়; ঘটনার ভেতরের তথ্য যত দ্রুত সম্ভব, তবে অবশ্যই নির্ভুলভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাও বড় দায়িত্ব।

‘সাংবাদিক প্রবেশ নিষেধ’, তবুও খবরের খোঁজে

সবচেয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল বাবুনগর মাদ্রাসায় সেই বৈঠককে ঘিরে। বৈঠকের ভেন্যুতে ছিল ‘সাংবাদিক প্রবেশ নিষেধ’। অথচ বৈঠকটি নিয়েই ছিল সবার তুমুল আগ্রহ।

ভেতরে কী হচ্ছে, কারা থাকছেন, কী আলোচনা হচ্ছে- এসব তথ্যের জন্য বাইরে অপেক্ষায় সংবাদকর্মীরা। অন্যদিকে অফিস থেকে একের পর এক ফোন। ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নেই, অথচ খবরের আপডেট দিতে হবে।

ফলে বাইরে থেকেই শুরু হয় তথ্যের খোঁজে ছুটোছুটি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা, অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া, একেকটি তথ্য একাধিক সূত্রে নিশ্চিত করা- সব মিলিয়ে তৈরি হয় বেশ কঠিন এক পরিস্থিতি।

হ্যাঁ, এটাই সাংবাদিকতা।

কখনো ঘটনাস্থলের একেবারে কেন্দ্রে থেকে খবর সংগ্রহ করতে হয়, আবার কখনো দরজার বাইরে দাঁড়িয়েও ঘটনার ভেতরের তথ্য খুঁজে বের করতে হয়। বাবুনগর মাদ্রাসার সেই দিনটি ছিল ঠিক তেমনই এক অভিজ্ঞতা।

হেলিপ্যাডে প্রবেশের পাস না থাকায় বাড়ে চ্যালেঞ্জ। 

এর চেয়েও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে পেলাগাজী সিএন্ডবি মাঠে নির্মিত হেলিপ্যাডে সংবাদ সংগ্রহের বিষয়টি। সংবাদকর্মীদের জন্য প্রবেশের পাস না থাকায় মাঠে ঢুকে সরাসরি সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ ছিল না।

অথচ প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার অবতরণ, তাঁর আগমন এবং পরবর্তী কর্মসূচির প্রতিটি মুহূর্তের খবর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চাপ ছিল। ফলে দূর থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা, ছবি-ভিডিও সংগ্রহ এবং দ্রুত তথ্য নিশ্চিত করে অফিসে পাঠাতে হয়েছে।

নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রবেশের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংবাদ সংগ্রহের এই প্রচেষ্টা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। একদিকে মাঠে ঢোকার সুযোগ নেই, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খবর দিতে হবে-

বাস্তবতা; সেদিনের সাংবাদিকতার কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়।

সাংবাদিকতা শুধু গলায় কার্ড ঝোলানোর নাম নয়

এই পুরো সফরের অভিজ্ঞতায় আরেকটি বিষয় চোখে পড়েছে- বড় কোনো অনুষ্ঠান এলেই হঠাৎ করে সাংবাদিকতার মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন কিছু ‘একদিনের’ ভুঁইফোড় সাংবাদিক। হাতে মাইক্রোফোন, গলায় প্রেস লেখা কার্ড কিংবা মোবাইল ক্যামেরা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোতে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়।

কখনো সস্তা দামের একটি প্রেসকার্ড গলায় ঝুলিয়েই এমন ভাবসাব দেখানো হয়, যেন তিনিই এলাকার সবচেয়ে বড় সাংবাদিক। আর সেই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয় বিভ্রান্তি- কে নিয়মিত সাংবাদিক, আর কে শুধু বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের দিনে সাংবাদিকের পরিচয়ে হাজির হয়েছেন।

তবে সাংবাদিকতা শুধু গলায় একটি প্রেসকার্ড ঝোলানো কিংবা হাতে মাইক্রোফোন রাখার নাম নয়। সাংবাদিকতা মানে প্রতিদিনের মাঠে থাকা, তথ্যের পেছনে ছোটা, একাধিক সূত্রে তথ্য যাচাই করা, ভুল হলে তার দায় নেওয়া এবং পাঠকের কাছে সত্য ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়া।

একটি বড় রাজনৈতিক সফরের দিন হয়তো অনেকেই সাংবাদিকের পরিচয়ে মাঠে নামেন। কিন্তু সাংবাদিকতা কোনো একদিনের পেশা নয়; এটি প্রতিদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার বিষয়।

যারা বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে খবরের পেছনে ছুটে চলেন, তাদের সঙ্গে একদিনের উপস্থিতিকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।

দৌড়টা শুধু সংবাদের পেছনে নয়!

পেলাগাজী দিঘির সিএন্ডবি মাঠ থেকে বাবুনগর মাদ্রাসা- দৌড়টা শুধু একটি খবরের পেছনে ছিল না। এই দৌড় ছিল সময়ের সঙ্গে, দায়িত্বের সঙ্গে এবং নিজের এলাকার মানুষের কথাগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরার তাগিদে।

প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ হয়েছে। মাঠের ব্যস্ততাও কমেছে। কিন্তু গত কয়েক দিনের সেই দৌড়ঝাঁপ, বৃষ্টি-রোদ, অফিসের ডেডলাইন, একের পর এক ফোন আর খবরের পেছনে ছুটে চলার দিনগুলো সাংবাদিকতার পথচলায় হয়তো আলাদা একটি গল্প হয়ে থাকবে।

একটি বড় রাজনৈতিক সফর শেষ হলেও মাঠের সাংবাদিকের কাজ শেষ হয় না। বরং প্রতিটি এমন সফর রেখে যায় নতুন কিছু শেখার অভিজ্ঞতা- সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে তথ্য খুঁজে নিতে হয়, চাপের মধ্যে কীভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং সবশেষে কীভাবে নিজের এলাকার মানুষের কথাটুকু সঠিকভাবে তুলে ধরতে হয়।

শেষ পর্যন্ত পরিচয় কোনো কার্ডে নয়, পরিচয় তৈরি হয় কাজে। পেলাগাজী দিঘির থেকে বাবুনগর- সেই দৌড় ছিল শুধু খবরের জন্য নয়; ছিল পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা। আর সেই দৌড়ই হয়তো আবারও মনে করিয়ে দিল-

একদিনের সাংবাদিকতা সাংবাদিকতা নয়; সাংবাদিক হতে হবে দায়বদ্ধতার।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, ফটিকছড়ি প্রতিদিন।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?