শেষ হয়ে আসা কাগজের ভাঁজে পরিতোষের জীবন

সোলাইমান আকাশ

পরিতোষ দে

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে তাঁর। একসময় কাঁধে কিংবা সাইকেলের ক্যারিয়ারে থাকত হাজার হাজার পত্রিকার বান্ডিল। এখন সেই বান্ডিল অনেকটাই ছোট। তবুও অভ্যাসের সেই ভোর বদলায়নি। পত্রিকা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পরিতোষ দে। 

রাউজানের হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর সর্তা গ্রামে জন্ম তাঁর। সর্তা খালের বালি-মাটি আর পানিতে কেটেছে শৈশব-কৈশোর। সেই গ্রামের পথ, খাল আর মানুষের সঙ্গে বেড়ে ওঠা পরিতোষের জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে সংবাদপত্রের কাগজের গন্ধ।

পরিতোষ দে’র পত্রিকা বিলির গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জেঠা অকুন্দ শীলের নাম। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অকুন্দ শীল চট্টগ্রাম শহর থেকে রেলগাড়িতে করে নাজিরহাট, নানুপুর, আজাদী বাজার, তকিরহাট, আমিরহাট, রাউজানের মুন্সিঘাটা ও গহিরা পর্যন্ত পত্রিকা নিয়ে যেতেন। কখনো সাইকেলে, কখনো রিকশায়, আবার কখনো হেঁটেই পত্রিকা পৌঁছে দিতেন মানুষের হাতে।

তখনকার দিনে সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়া ছিল আজকের মতো সহজ কাজ নয়। এক দিনের পত্রিকা কখনো দুই দিনে, আবার দুই দিনের পত্রিকা তিন দিনেও পৌঁছাত পাঠকের হাতে। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও খবর পৌঁছে দেওয়ার এই নিরন্তর চেষ্টাই ছিল তাঁদের জীবনের অংশ।

অকুন্দ শীলের ছেলে দুলাল শীল পরে গহিরা থেকে আজাদী বাজার পর্যন্ত পত্রিকা বিলির লাইন ধরেন। তাঁর সঙ্গে সহযোগী হিসেবে যুক্ত হন পরিতোষ। এরপর ১৯৮০ সাল থেকে নিজেই নিয়মিত পত্রিকার হকার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।

দীর্ঘ ৪৬ বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। বদলে গেছে মানুষের জীবন, যোগাযোগব্যবস্থা, সংবাদ গ্রহণের ধরন। একসময় পরিতোষ প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার পত্রিকা বিলি করতেন। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১২০টির মতো।

তবু পেশাটি ছাড়েননি পরিতোষ। কারণ তাঁর কাছে পত্রিকা শুধু কয়েকটি কাগজের পাতা নয়। এটি মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার একটি দায়িত্ব, জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা একটি অভ্যাস। কয়েক দশক ধরে তিনি দেখেছেন পাঠকের হাতে নতুন পত্রিকা পৌঁছানোর আনন্দ, আবার দেখেছেন প্রযুক্তির বিকাশে ধীরে ধীরে ছাপা পত্রিকার পাঠক কমে যেতে।

একসময় যে পথ ধরে শত শত মানুষের বাড়িতে খবর পৌঁছে দিতেন, সেই পথেই এখন হাতে গোনা কিছু পত্রিকা নিয়ে চলেন পরিতোষ। পত্রিকার সংখ্যা কমেছে, কিন্তু তাঁর অপেক্ষা কমেনি। ভোর হলে আজও তিনি বেরিয়ে পড়েন।

সময়ের পরিবর্তনে সংবাদপত্রের জগত বদলে গেলেও পরিতোষ দে যেন সেই পুরোনো দিনের এক জীবন্ত সাক্ষী। তাঁর কাঁধে এখন আর দেড় হাজার পত্রিকার ভার নেই; আছে কয়েক দশকের স্মৃতি, সংগ্রাম আর পেশার প্রতি এক অদ্ভুত টান।

একসময় তাঁর হাতে ছিল মানুষের প্রতিদিনের খবর। এখন সেই খবরের কাগজের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু পরিতোষ দে’র জীবনকাহিনি নিজেই হয়ে উঠেছে এক দীর্ঘ সংবাদ- একজন পত্রিকা হকারের, যিনি চার দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের দরজায় দরজায় পৌঁছে দিয়েছেন সময়ের গল্প।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?