নাগরিকদের ঘরে বসে সরকারি সেবা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য জানার সুযোগ করে দিতে চালু করা হয়েছে জাতীয় তথ্য বাতায়ন। অথচ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেই নেই প্রয়োজনীয় ও হালনাগাদ তথ্য। কোথাও বছরের পর বছর পুরোনো কর্মকর্তার নাম-পরিচয় রয়ে গেছে, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরি ফাঁকা। সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, প্রকল্প, সুবিধাভোগী, টেন্ডার, অফিস আদেশ, সেবার তালিকা ও নাগরিক সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনলাইনে থাকার কথা থাকলেও ফটিকছড়ির অধিকাংশ দপ্তরের ওয়েবসাইট ঘুরে এসব তথ্যের ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে ঘরে বসে সরকারি সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য—‘ডিজিটাল যুগে তথ্যের সততা রক্ষা : তথ্য বিভ্রান্তি দূরীকরণে তথ্য অধিকারের ভূমিকা।’ জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা ও তথ্য পৌঁছে দিতে ২০১৪ সালের ২৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন। এর আওতায় মন্ত্রণালয় থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত হাজার হাজার সরকারি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে।

ফটিকছড়ি উপজেলার সরকারি তথ্য বাতায়নের বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা যায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অন্য কর্মস্থলে যোগদানের জন্য ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. হাসান মুরাদ চৌধুরী বিদায় নেন। তাঁর স্থলে চলতি বছরের মার্চের শুরুতে দায়িত্ব নেন নতুন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রব। কিন্তু তথ্য বাতায়নে এখনো কর্মকর্তার দায়িত্বে হাসান মুরাদ চৌধুরীর নামই রয়েছে।
একই দপ্তরের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হাসানুল কবিরও ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব শেষে বিদায় নেন। তাঁর স্থলে দায়িত্ব নিয়েছেন মো. আলাউদ্দিন। কিন্তু তথ্য বাতায়নে এখনো তাঁর নাম ও পরিচয় যুক্ত করা হয়নি।

নতুন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রব ফটিকছড়িতে যোগদানের ৬ মাস হলেও তথ্য বাতায়নে এখনো কর্মকর্তার দায়িত্বে হাসান মুরাদ চৌধুরী!
নির্বাচন অফিসেও পুরোনো তথ্য
উপজেলা নির্বাচন অফিসের ওয়েবসাইটেও একই চিত্র। ওই দপ্তরে দায়িত্ব পালন করা নির্বাচন কর্মকর্তা দেবাশীষ দাশ ও অরুণ উদয় ত্রিপুরা দায়িত্ব শেষে অন্য কর্মস্থলে চলে গেলেও তথ্য বাতায়নে এখনো তাঁদের পূর্বসূরি নির্বাচন কর্মকর্তা হুমায়ন কবিরের নাম দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচন অফিসে নাগরিকরা কী কী সেবা পাবেন, সে সংক্রান্ত সেবা তালিকা বা সিটিজেন চার্টারের কোনো তথ্য নেই।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার তথ্যও নেই
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও রয়েছে তথ্যের ঘাটতি। গত মার্চে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন ডা. তৌহিদুল আলম। যোগদানের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সরকারি তথ্য বাতায়নে তাঁর নাম, পদবি, মোবাইল নম্বর কিংবা যোগদানের তারিখ—কোনোটিই উল্লেখ করা হয়নি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কী কী সেবা পাওয়া যায়, সে সংক্রান্ত সেবা তালিকা বা সিটিজেন চার্টারের কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে জানতে ডা. তৌহিদুল আলমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

একইভাবে উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসের ওয়েবসাইটেও নাগরিকদের সেবা গ্রহণের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে মাসিক সাধারণ সভা, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাসহ বিভিন্ন কমিটির সভা আহ্বানের নোটিশ নিয়মিত প্রকাশ করা হলেও এসব সভার কার্যবিবরণী বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ওয়েবসাইটেও রয়েছে তথ্যের ঘাটতি। অফিস আদেশ, খবর, টেন্ডার ও চাকরি কর্নারের বিভিন্ন অংশ ফাঁকা পড়ে আছে।
অথচ এ দপ্তরের মাধ্যমে ফটিকছড়িতে সড়ক, সেতু, কালভার্টসহ বিপুল পরিমাণ সরকারি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হয়। এসব প্রকল্প ও টেন্ডার-সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে সহজে পাওয়ার কথা থাকলেও ওয়েবসাইটে তার প্রতিফলন নেই।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও বীর মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক ও বিধবা ভাতাভোগী, এতিমখানা এবং সমাজসেবামূলক সংগঠনগুলোর হালনাগাদ তথ্য নেই। উপজেলার একমাত্র সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফটিকছড়ি করোনেশন সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেরও সিংহভাগ তথ্য ফাঁকা। সিলেবাস, ক্লাস রুটিন, ভর্তি, পরীক্ষা ও ফলাফলসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তথ্য বাতায়নে তথ্য হালনাগাদ না থাকার বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রব বলেন, ‘আমাদের ওয়েবসাইটের ই-মেইল ও পাসওয়ার্ড হারিয়ে যাওয়ায় সাইটে তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি। ই-মেইল ও পাসওয়ার্ড উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। আশা করছি, খুব দ্রুত ওয়েবসাইটের তথ্য হালনাগাদ করা হবে।’
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রকর চাকমা সাইটে তথ্য হালনাগাদ না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে তথ্য আপডেট করার প্রতিশ্রুতি দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘তথ্য বাতায়ন সাইটে দ্রুত তথ্য হালনাগাদের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।’



