শতবর্ষী এক বৃদ্ধ বাবা মুহাম্মদ মুছা। তাঁর আট ছেলে। একজন প্রয়াত। জীবন শায়াহ্নে এসে পবিত্র মক্কা নগরীর উদ্দেশ্যে ওমরাহ হজ্ব করার নিয়ত করেন তিনি। যথারীতি সব ছেলেদের কাছে কিছু কিছু টাকা চান। ছেলেরা সামান্য কিছু দিতে চাইলে তাতে হজ্বের খরচ পোষায় না। অগত্যা বৃদ্ধ বাবা সিদ্ধান্ত নেন তাঁর নিজের জমি বিক্রি করবেন। সে টাকায় তিনি পবিত্র হজ্ব পালন করবেন। অবশেষে নিজের জমি নগদ টাকায় বিক্রি করেন এক ছেলের কাছে। এতেই বাঁধে বিপত্তি। অন্য ছেলেরা চরমভাবে খেপে যায় তাঁর উপর। তাদের দাবী ভালো জমিটাই বাবা বিক্রি করে দিলেন এক সন্তানের কাছে।
বাকি ছেলেরা বৃদ্ধ বাবার জীবন দুর্বিষহ করে তোলেন। চলে নানামুখি অত্যাচার আর অবিচার। দেন জানে মেরে ফেলার হুমকিও। বিষয়টি সমাধানে বসেন স্থানীয় সমাজের গন্যমান্য মুরব্বিরা। হয়না; সবাইকে নিয়ে বসেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও। তাতেও কোনো কুল কিনারা হয়না। বিপাকে পড়েন সেই বৃদ্ধ বাবা।
অবশেষে এলাকার কিছু সচেতন নাগরিক বিষয়টি জানান ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে। তিনি বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে নেন। আদ্যোপান্ত জেনে-শুনে ছুটে যান ওই বৃদ্ধ বাবার বাড়িতে। সোমবার (১০ নভেম্বর) ফটিকছড়ি পৌরসভার জব্বারিয়া স্কুলের পাশে সেই বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়ে সবার সাথে কথা বলেন তিনি। ছেলেদের উপস্থিতিতে একে একে উপস্থিতিদের বক্তব্য শুনেন।
পরে ইউএনও বৃদ্ধ বাবার ছেলেদের কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন এবং ভবিষ্যতে তারা তার বাবার ব্যাপারে কোনরূপ অবহেলা, হুমকি ও অযতœ করলে প্রচলিত আইন মোতাবেক ব্যাবস্থা গ্রহণের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বাবার প্রতি ছেলেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত করেন এবং বিনয়ের সাথে সদয় হতে পরামর্শ দেন। এসময় এলাকায় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। দীর্ঘসময় পর উদ্ভুদ ঘটনার পরিসমাপ্তি টানেন ইউএনও।
সেই বৃদ্ধ বাবা আসছে ১৬ নভেম্বর আল্লাহর ঘরের উদ্দেশ্যে হজ্বব্রত পালনে যাত্রা করবেন বলে নিশ্চিত করেন। এর আগে তিনি উপস্থিত সবার কাছে দোয়া চান এবং দেশ-জাতির জন্য মঙ্গল কামনা করেন। এসময় উপস্থিতদের সামনে ওই বৃদ্ধ বাবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি এই আপাদমস্তক এক মানবিক কর্মকর্তার জন্য সবার কাছে দোয়া চান এবং ইউএনওর জীবন দর্শন সবাইকে অনুসরণ করার অনুরোধ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক কর্মী মো. নুরুল আলম নুরু বলেন, ‘ইউএনওর কথা সবাই মনোযোগ সহকারে শুনেছেন। উপলব্দি করেছেন। সেই মতে আগামী ১৬ নভেম্বর তিনি হজ্বব্রত পালনে যাবেন। এতেই সবাই খুশি।’
খবরটি মঙ্গলবার সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইজবুকে ছড়িয়ে পড়লে বহুমুখী প্রশংসায় ভাসতে থাকেন প্রশাসনের এই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা।
উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও পৌর বিএনপি নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী লিখেন, ‘আল্লাহ যেনো কোনো বাবাকে এরকম ছেলে না দেয়। এসব মহৎ কাজের জন্য ফটিকছড়িবাসী আপনাকে আজীবন মনে রাখবেন।’
আবু ইউসুফ লিখেন, ‘এটাই সমাজসেবা। এটাই আপনার শিক্ষা ও যোগ্যতা। ইতিহাসের অন্যন্য দৃস্টান্ত দেখালেন। স্যালুট জনবান্ধব ইউএনও আপনাকে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘¯্রস্টার সান্নিধ্য পেতে তিনি হজ্বব্রত পালন করতে মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু তিনি এভাবে সন্তানদের হাতে কষ্ট পাবেন ভাবেন নি। হয়ত নিজের কষ্ট কমিয়ে হালকা হতে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। ইউএনও বলেন, ‘আমাদের সবার উচিৎ পিতা-মাতার প্রতি সদয় হওয়া। যে পিতা-মাতা আমাদের লালন-পালন করে মানুষ করেন, তাদের প্রতি অবিবেচক হওয়া মোটেই ভালো খবর নয়।’




