প্রকৃতি প্রেমীরা “প্রকৃতির ফুসফুস’ নামে আখ্যায়িত করেন হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে। এটি ফটিকছড়ি পশ্চিমাংশে সীতাকুন্ড -রামগড় রিজার্ভ ফরেস্ট অঞ্চল। নানান প্রতিকুলতায় হারাতে হারাতে শেষ ধ্বংসাবশেষ ধরে রাখতে সরকার ও বন বিভাগ ২০১০ সালে ১ হাজার ১৭৭ হেক্টর বনভুমি অঞ্চলকে “হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য” এলাকা ঘোষনা করেন।
এই অভয়ারণ্যকে বর্তমান সময়ে ফটিকছড়ির ফুসফুসও বলা হচ্ছে। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে এ নামেই ডাকেন এটিকে। এখানকার ঘন সবুজ অরণ্য, ঝিরি-ছড়া, বিরল প্রাণী এবং বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদের সমাহারে এ অভয়ারণ্য পুরো এলাকার পরিবেশ-ব্যবস্থাকে ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু একই সঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত এই অভয়ারণ্য এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
হাজারীখিল অভয়ারণ্য দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী এখানে রয়েছে প্রায় ২৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৫০ প্রজাতির পাখি, ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী রয়েছে। তারমধ্যে রয়েছে হিমালিয়ান সেরু (বন ছাগল) এবং ঢেলু (বন কুকুর)। এছাড়া মায়া হরিণ, মুখপোড়ো হনুমান, চিতা বিড়াল, কাঁকড়াভুক বেজি, মেছোবাঘ ও অজগরসহ বহু প্রাণীর দেখা মেলে এ অভয়ারণ্যে।
পাখিপ্রেমীদের কাছে অঞ্চলটি তাদের স্বর্গরাজ্য। এখানে হুদহুদ, হুতুম পেঁচা, ময়ূর, নীলকান্ত, বসন্তবাউড়ি, সুইচোরা, টুনি, শঙ্খচিলসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি বিদ্যমান। যা দেশের অনেক অঞলেই নেই। বিপন্নপ্রায় পাখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাঠ ময়ূর অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির হওয়ায় যাকে দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার সে প্রাণীও এখানে আছে।
বনের অন্যতম বিস্ময়কর বৈলাম নামের বিরল বৃক্ষ, যার উচ্চতা প্রায় ১০০ মিটার। বন গবেষকদের মতে, এ ধরনের বৈলাম গাছ দেশে আর কোথাও নেই বললেই চলে। যেটি বর্তমানে দেশের হারিয়ে যাওয়া উদ্বিদে জায়গা করে নিয়েছে।
হাজারীখিলকে ঘিরে রয়েছে পাহাড়, ঝরনা, রাবার বাগান, রাঙাপানি চা-বাগান ও প্রাকৃতিক ট্রেইল। এসব কারণে জায়গাটি ইকো-ট্যুরিজমের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। প্রতিদিনই প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণ পিপাসুদের ভিড় দেখা যায় এখানে।
এই অপার সম্ভাবনায় অভয়ারণ্য এখন নানা সমস্যায়। বনের গভীরে নিয়মিত কাঠ পাচারের অভিযোগ আছে। মূল্যবান কাঠ কেটে নিয়ে যাওয়ায় বনভূমির ঘনত্ব কমে যাচ্ছে। হরিণ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ অবৈধ শিকার। বনের সীমানা ঘেঁষে বসতি ও কৃষিকাজ বাড়ায় সংকুচিত হচ্ছে অভয়ারণ্যের আস্তরণ। এছারা প্লাস্টিক বর্জ্য, নিরাপত্তাহীনতা ও নিয়ন্ত্রণহীন জনসমাগমে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনাঞ্চলের সংবেদনশীল পরিবেশ।
বন গবেষক ও বনবিভাগ সুত্র জানায়, ‘জীববৈচিত্র্যের উন্নয়ন ও এসব রক্ষায় এখনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থান না নিলে দেশের সমৃদ্ধ বনাঞ্চলের অস্তিত্ব হারানোর পাশাপাশি এই অভয়ারণ্য ধ্বংস হবে। সেই সাথে ‘ফটিকছড়ির ফুসফুস’ নিভে গিয়ে আমাদের প্রকৃতির কান্না শুনতে হবে। ঘন সবুজ অরণ্য, ঝিরি-ছড়া, বিরল প্রাণী এবং বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ জীবনের অনন্য অনুষঙ্গ। যা পরিবেশ ব্যবস্থাকে ধরে রাখার প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।’



