১৪ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাহাড়ের নারীর জীবনের গতি: বাড়িয়ে দিয়েছে বাইক স্কুটি

প্রদীপ চৌধুরী

ভৌগলিক বৈরিতা আর জীবন বাস্তবতায় পাহাড়ের নারীরা প্রতিনিয়িতই সংগ্রামমুখর এক জীবনের মুখোমুখি হন। প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর‌্যন্ত এই যাপনের রঙ ও মাত্রা ভিন্ন হলেও প্রায় একই রকম। ১৯৯৭ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর পাহাড়ের নারীদের জীবনে একটি বাড়তি স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে এনজিও তৎপরতা। দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থার নানামুখী কর্মসূচিতে কর্মসংস্থানের বড়ো একটি জায়গাজুড়ে স্থান করে নেন শিক্ষিত নারীরা। মাঠে-অফিসে, অংশীজনের দুয়ারে, প্রশাসনিক কাজে শহরে হোক আর তৃণমূল স্থানীয় সরকারে: যেখানেই যাবেন পথ তো বন্ধুর।

তিন জেলার মধ্যে বান্দরবান প্রায় পুরোটাই সুউচ্চ পাহাড়, রাঙামাটির অধিকাংশ পানিপথ আর খাগড়াছড়ি হলো পাহাড়ের মাঝে মাঝে সমতল জনপথ। ফলে খাগড়াছড়িতেই সবার আগে নারীরা পথে নামান নিজের বাহন মোটর সাইকেল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি শহরের জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ও স্কুল শিক্ষক সুচরিতা রোয়াজা ‘বাইক’ নামের বাজাজ কোম্পানির একটা ৫০ সিসি গাড়ি কিনেন। তিনি এই বাহনে হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে দাপিয়ে বেড়ানো শুরু করলে সবার মনের চিন্তা রেখায় একটি কম্পন তৈরি হয়। সেই কম্পনের পথ ধরে খাগড়াছড়িতে বড়ো এনজিওগুলো; বিশেষ করে ব্রাক-প্রশিকা-কেয়ার-কারিতাসও আগ্রহী নারী কর্মী ও কর্মকর্তাদের বাহন হিসেবে মোটর সাইকেল সরবরাহ করতে থাকেন। এখন খাগড়াছড়ি জেলার যে প্রান্তেই যাবেন, যেখানে পাকা-আধাপাকা সড়ক: এমনকি প্রত্যন্ত মেঠো পথেও বাইক আরোহী নানা বয়সের নানা পেশার নারীর দেখা মেলে। এখন খাগড়াছড়ি জেলাজুড়ে একলক্ষ টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে ছয় লক্ষ টাকা দামের দুই’শরও বেশি বাইকের চাকা ঘুরছে নারীর হাতে। যেটি বলা চলে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। জেলার অর্থনীতিতেও এটির একটি বড়ো প্রভাব তৈরি করেছে।

এরমিধ্যে খাগড়াছড়িতে নারী বাইকারদের সংঘবদ্ধতা, গ্রুপট্যুর, নানামুখী তৎপরতার প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে নারী বাইকার পৃথক দুটি সংগঠনও। এই দুটি সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে অনেকগুলো সমাজকল্যাণ উদ্যোগও।

এরই একটি খাগড়াছড়ির কেজিসি লেডি বাইকার গ্রুপ। এই গ্রুপের এডমিন নুর আয়েশা বেগম জানান, বর্তমান সময়ে নারীরা ঘরে বাইরে তথা কর্মক্ষেত্রসহ সর্বত্র তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ছাপ রাখছেন। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতসহ বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেয়া ও দৈনন্দিন কাজের জন্য নারীদের পাবলিক পরিবহনগুলোর দ্বারস্থ হতে হলে অনেক সময় নষ্ট হয়। নিজের বাহনে সময়-অর্থ এবং শ্রম দুটোই স্বাশ্রয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, খাগড়াছড়িতে নারীদের মোটর সাইকেল ও স্কুটি চালানোর অনুপ্রেরণা থেকে ২০২১ সালের ১১ আগস্ট এডমিন কেলি চৌধুরী সর্ব প্রথম খাগড়াছড়িতে কেজিসি লেডি বাইকার গ্রুপ নামে একটি অনলাইন গ্রুপ তৈরি করেন। অনলাইনে গ্রুপ খোলার পর খাগড়াছড়ির নারী রাইডাররা একত্রিত হয়ে সর্বপ্রথম মহালছড়ি–সিন্দুকছড়ি পর্যন্ত একটি গ্রুপ ট্যুর আয়োজন করেন, যা পরবর্তীতে একটি বড় কমিউনিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই গ্রুপে থাকা নারী রাইডাররা তাঁদের দৈনন্দিন যাতায়াতকে সহজ করতে স্কুটার ব্যবহার করার পাশাপাশি বাইকে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছে দারুণ বন্ডিং। তাছাড়া কেজিসি লেডি বাইকার গ্রুপের সদস্যরা খাগড়াছড়ি থেকে বিভিন্ন সময়ে বান্দরবান, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ট্যুর দিয়ে তারা নিজেদের জীবনে অ্যাডভেঞ্চার ও আনন্দের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

গ্রুপের মডারেটর ও বাইকার সীমা ত্রিপুরা জানান, এই গ্রুপটি অসাধারণ ও প্রাণবন্ত বাইকার আপুদের গ্রুপ।

বাইকার তৃষিতা চাকমা চমচমি জানান, তিনি গানের শিক্ষকতা করেন। নিজের বাইক থাকায় তিনি দূরদূরান্তে থাকা বাচ্চাদের কাছে নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাতে পারেন। এতে তার অনেক সময় সাশ্রয় হয়।

বাইকার স্বান্তনা মারমা বলেন, তিনি একজন শিক্ষক ও যথাসময়ে স্কুলে পৌঁছাতে নিজের বাইকের জুড়ি মেলা ভার। বাইকার নীলা চৌধুরী একজন ফুটবল খেলোয়াড়। তিনি পাশাপাশি কেজিসি লেডি বাইকার গ্রুপের স্কুটি প্রশিক্ষক হিসেবে আগ্রহী নারীদের বাইক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। বাইকার জাহানারা বেগম বলেন, তিনি একটি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেন। স্কুল অনেক দূরে হওয়ায় বেশ কয়েকটি গাড়ী বদলাতে হতো স্কুলে পৌঁছাতে। এখন নিজের বাইক চালিয়ে তিনি যথাসময়ে স্কুলে পৌছাতে পারেন। বাইকার আসমা আক্তার জানান, তিনি একটি এনজিওতে কর্মরত আছেন। কাজের প্রয়োজনে তাকে অনেক দূর দূরান্তে যেতে হয়। তার নিজের বাইক থাকায় তিনি যথাসময়ে তার সব কাজ সম্পন্ন করতে পারেন । তাছাড়া পানছড়িতে থাকা বাইকার অনিতা চাকমা অনি, নার্গিস আক্তার, রামগড়ে থাকা বাইকার মাবিয়া আক্তার পান্নাসহ বাইকার হেন্টি চাকমা, বাইকার রুনা চাকমা, বাইকার সুস্মিতা চাকমা, বাইকার ধীনা ত্রিপুরা, পিঙ্কি বড়ুয়া সকলেই তাদের কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য বাইক ব্যবহার করেন। খাগড়াছড়ি লেডি বাইকার গ্রুপের বেশির ভাগ সদস্যেরই মোটরসাইকেল লাইসেন্স আছে।

বর্তমানে খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন বয়সী দুই শতাধিক নারী মোটর সাইকেল ও স্কুটি ব্যবহার করে নিজেদের দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন করেন। এখন খাগড়াছড়ির এই নারীরা কাজের ফাঁকে মোটরসাইকেল আর স্কুটার নিয়ে পাহাড়ের প্রতিটি রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন—নিজেদের শক্তি, স্বাধীনতা ও ভালোবাসাকে সঙ্গে নিয়ে.. ।

খাগড়াছড়ি জেলাশহর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরের উপজেলা লক্ষ্মীছড়িতে স্বাস্থবিভাগে কাজ করেন, হেলি চাকমা। নানা সামাজিক কাজকর্মেও তিনি সিদ্ধহস্ত।

হেলি জানান, তখন দু একজনই নারী বাইক বা স্কুটি চালনো দেখে খুব ইচ্ছে ছিলো স্কুটি চালানো শিখবো। এটা অনেক দিনের ইচ্ছে বা শখ ছিলো আমার। সে থেকে স্কুটি চালানো এরপর বাইক। স্কুটি চালাতে পারাটা আমাদের নারীদের জন্য অত্যন্ত জরুরী। এতে নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলে। আজ আমি স্কুটি চালাতে পারি বিধায় আমি আমার কর্মস্থল যেতে পারি নির্ধিদ্বিধায়। তার আগে কিন্তু আমি আমার হাসবেন্ডের উপর নির্ভর ছিলাম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বরে খাগড়াছড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় খাগড়াছড়ি ফিমেল রাইডারস গ্রুপ । আর জানুয়ারি ১ তারিখেই শীতার্তদের কম্বল বিতরন গ্রুপটির শুভ উদ্বোধন করা হয়। সেই থেকে আমাদের পথচলা। ৭ জন এডমিন প্যানেল দিয়ে গ্রুপটি পরিচালিত হয়। আমাদের নির্দিষ্ট কোন সদস্য সংখ্যা নেয়। তবে আনুমানিক ৩০-৪০ জন সদস্য আমরা এক্টিভ আছি।যেহেতু এটি একটি গ্রুপ তাই আমরা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কাজ করি এ গ্রুপের মাধ্যমে। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো বন্যার সময় ত্রাণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, রোজার সময় দুঃস্থ পরিবারের পাশে ইফতারের সামগ্রী বিতরণ, ব্লাড ডোনেশন, দুঃস্থ অসুস্থ রোগীদের নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়া আরো বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কার্যক্রম।

নারীদের স্কুটি চালোনায় দক্ষ করার লক্ষ্যে খাগড়াছড়ি ফিমেল রাইডারস গ্রুপ থেকে স্কুটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান আছে। এ গ্রুপে দুজন প্রশিক্ষক হচ্ছে আনু মার্মা এবং এলিপ্রু মার্মা। তারা খুবই দক্ষতার সহিত এ প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ। এই গ্রুপের মিশনঃ- ১

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?