১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাগড়াছড়ির শেফালিকা ত্রিপুরা; বৃত্ত ভেঙ্গে জেগে উঠা এক অগ্রনারী

প্রদীপ চৌধুরী

পাহাড়িয়া জনপদ খাগড়াছড়ি’র দূর্গম ও প্রত্যন্ত গোমতী গ্রামে জন্ম নেয়া, শেফালিকা ত্রিপুরা, বৃত্ত ভেঙ্গে জেগে উঠা এক অগ্রনারী। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় ১৯৮৮ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত, এই তিন দশককের বেশি সময় ধরে তিনি প্রতিনিয়ত নির্মাণ করেছেন, মানুষের জন্য আপন মমতা-শ্রম আর ভালোবাসার ঠিকানা। ফলে ধীরে ধীরে সমাজের কাছে তিনি হয়ে উঠেন অন্যরকম এক মানুষ। তাঁরই কল্যাণকর্মের সৃষ্টি “খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি (কেএমকেএস)” এখন তিন পার্বত্য জেলার অনগ্রসর নারীদের এগিয়ে যাবার এক সিঁড়ি।

কেএমএকএস, নামের এই প্রতিষ্ঠান আজ শুধু তিন পার্বত্য জেলাতেই নয়, পরিচিতি পেয়েছে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক অঙ্গনেও। কাজের পরিধি যেমন বেড়েছে, বেড়েছে সুবিধাভোগী মানুষের সংখ্যাও। কয়েক’শ কর্মী নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন, এই কেএমএকএস-এ কাজ করে। পাড়াকেন্দ্রীক ছোট্ট একটি সমিতি দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও শেফালিকা ত্রিপুরা’র পরিশ্রমী একাগ্রতায় খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি এখন বেসরকারী উন্নয়ন খাতে একটি সাহসী ঠিকানা। অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী পেশাদার উন্নয়নকর্মী হবার স্বপ্ন নিয়ে স্বেচ্ছায় যুক্ত হতে চান, এই প্রতিষ্ঠানে। শেফালিকা ত্রিপুরা, এখন ৬৫ বছর বয়সী এক মানুষ তাই অতি সম্প্রতি সংগঠনের নির্বাহী দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে বেছে নিয়েছেন, অবৈতনিক সভাপতির পদ।

ব্যক্তি শেফালিকা ত্রিপুরা:
একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই ১৯৭৪ সালে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। তখন পড়তেন অষ্টম শ্রেণীতে। বিয়ের পর মাত্র ষোল দিনের মাথায় ফিরে আসেন বাবার বাড়ীতে। শুরু করেন লেখাপড়া, ১৯৭৭ সালে পাসও করেন এসএসসি। এর আগেই কোল আলো করে জম্ম নেয়, প্রথম কন্যা। প্রাথমিক শিক্ষক স্বামী অলিন্দ্র ত্রিপুরা’র অর্জিত অর্থে যেনো পরিবার চলেই না। একে একে জম্ম নিলো এক ছেলে আর দুই কন্যা সন্তান। নিজের সন্তান, দেবর-ননদদের লেখাপড়ার সুবিধা ও চাষ-বাসের লক্ষ্যে জ্ঞানমাপাড়া নামক এলাকায় খামারবাড়ী করে থিতু হলেন শেফালিকা। ১৯৮২ সালে তৎকালীন শান্তিবাহিনীতে লম্বা-বাটি (সশস্ত্র রাজনৈতিক বিরোধ) দেখা দিলে পাহাড়ের পরিবেশ হয়ে উঠে রক্তাক্ত। অনেকটা নিরাপত্তার তাগাদায় ১৯৮৫ সালে স্বামীর বদলির সূত্র ধরে স্ব-পরিবারে স্থায়ী হন, দীঘিনালা উপজেলা সদরে। মুলতঃ এখানেই নিজেকে বিকশিত করার এক উপায় খুঁজে পান তিনি। তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ইউনিসেফ’র প্রণোদনায় একটি নারী সমবায় সমিতি গড়ে তোলার প্রস্তাব আসে শেফালিকার কাছে। তিনি হলেন, পাড়াকেন্দ্রীক ওই সমিতির সভাপতি।

কর্মময় সময়:
১৯৮৬ সালে দীঘিনালায় ভয়াবহ এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধে। বহু পাহাড়ী দেশ ছেড়ে পালায় ভারতে। অসহায় হয়ে ফিরে আসেন, খাগড়াছড়ি শহরের খাগড়াপুর গ্রামে। কিন্তু সেই সমিতির হাল তিনি ছেড়ে দেননি। শহর থেকে গিয়ে গিয়ে তদারকি করতে থাকেন, সমিতির সব কাজকর্ম। সমাজের নানা জনের নানা অপছন্দনীয় কথা হজম করেই এগুতে থাকেন, সামনের দিকে। ছোটকাল থেকে সূঁচি সেলাইয়ের কাজের প্রতি বিশেষ মনোযোগ থাকায় ১৯৮৮ সালে নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা থেকে বিসিক থেকে ৬ মাসের বুনিয়াদী সেলাই প্রশিক্ষণ। এর আগেও তিনি টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করে পরিবারে যোগান দিতেন। ১৯৯২ সালে খাগড়াছড়ি শহরের মহাজনপাড়ায় সেলাইয়ের দোকান খুলে চারদিকে সাড়া ফেলে দেন। শেফালিকা ত্রিপুরা জোর গলায় বলেন, আমার সেলাইয়ের মাধ্যমে অর্জিত টাকায় ছেলেমেয়েরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি ছুঁয়েছে।

যেভাবে কেএমএকএস’র শুরু:
১৯৮৮-৮৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে খাগড়াপুর গ্রামের নারীদের নিয়ে খোলামাঠে একটি সভা আহ্বান করেন। সেই সভায় উপস্থিত ১’শ ২০ জন নারীকে নিয়ে গঠন করেন আজকের “খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি (কেএমএকএস)”। ১৯৯৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দিয়ে কাজ শুরু করে, “কেএমএকএস”। ১৯৯৯ সালে লাভ করেন, সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের রেজিষ্ট্রেশন। ২০০০ সালে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)-এর কাছ থেকে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের জন্য পান, নগদ ৮৭ হাজার টাকা। ২০০৩ সালে এনজিও ব্যূরো’র নিকন্ধন লাভের পর আর তাকাতে হয়নি পেছনে।

জনপ্রিয় নারী ব্যক্তিত্ব:
শেফালিকা ত্রিপুরা, ব্যক্তি হিসেবে অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক সবধরনের নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচীতে শামিল হন স্বেচ্ছায়। সেজন্য সর্বসাধারণের কাছে অর্জন করেছেন অনেক জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে অসহায় নারীদের নিজের পরিবারে আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি নেই। নারীর প্রশ্নে আইন-আদালতের ঝক্কি ঝামেলা এখন তাঁর নিত্যদিনের রুটিনওয়ার্ক। খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায়তো বটেই, তাঁর ডাক পড়ে দেশে এবং বিদেশেও। নারীপক্ষ-দূর্বার নেটওয়ার্কের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে বৃহত্তর অঞ্চলের নারী আন্দোলনে তিনি সূচনা করেছেন, ব্যতিক্রমী ও সৃজনশীল নানা ধারণা। কেএমএকএস’র বাইরে দেশী-বিদেশী অসংখ্য মর্যাদাবান সংগঠন এবং নেটওয়ার্কের সাথে তিনি যুক্ত আছেন।

নিজের মুখে শেফালিকা:
শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, আমরা এখন তিন পার্বত্য জেলার বাইরে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলায়ও কাজ করছি। আমরা নারী সংগঠন হিসেবে নারী অধিকার এবং নারী উন্নয়ন ইস্যুতে প্রধান মনোযোগ দিলেও সীমাবদ্ধ নই। পরিবেশ-স্বাস্থ্য-প্রাথমিক শিক্ষা-মানবাধিকার-আইনী সহায়তা-কৃষিসহ উন্নয়নের সবক্ষেত্রে অবদান রাখার চেষ্টা করছি। সেক্ষেত্রে একক-যৌথ এবং সম্মিলিত উদ্যোগেও আমরা শামিল হচ্ছি। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সরকারের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অনেক দাতা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির উন্নয়নে আরো ভূমিকা রাখতে চাই।

স্বীকৃতি ও অর্জন:
কেএমএকএস প্রতিষ্ঠা করে সমাজকল্যাণে অবদান রাখায়, শেফালিকা ত্রিপুরাকে ২০০৬ সালে দেশের অন্যতম পাক্ষিক পত্রিকা “অনন্যা”র পক্ষ থেকে শীর্ষদশ নারী হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয়। ২০০৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল এনজিও’র পক্ষ থেকে তাঁকে “শ্রেষ্ঠ উন্নয়ন ব্যক্তিত্ব”-র ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানীর রাফা প্লাজা’য় পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও হস্তশিল্প প্রসারের জন্য একটি বাণিজ্যিক প্লট প্রদান করা হয়। যেটি এখন ব্যবসাসফল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি জাপান, ফিলিপাইন, নেপাল, চিয়াংমাই এবং থাইল্যান্ড সফর করেছেন।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা:
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে তাঁকে প্রথমে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ’র সদস্য পদে মনোনীত করেন। এরপর জুলাই মাসে তাঁকে অস্থায়ী চেয়ারম্যান নিয়োগ করেন।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?