ফটিকছড়ির ছোট ছিলোনিয়া গ্রামের সেই ছোট্ট ঘরটিতে এখন আর রঙের গন্ধ নেই। নেই নতুন বউ ঘরে তোলার আনন্দ আয়োজনও। উঠোনজুড়ে শুধু কান্না, দীর্ঘশ্বাস আর এক শতবর্ষী দাদীর বুকফাটা আহাজারি। “এঁন অইবু জানিলি ভাইয়ুরে আঁই ঘরত বাঁধি রাইখতাম, এঁহন আঁই কেনে বাঁইচ্চুম!(এমন হবে জানলে ভাই’রে (নাতিকে) আমি ঘরে বেঁধে রাখতাম। এখন আমি কেন বেঁচে আছি)
কথাগুলো বলতে বলতেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শতবর্ষী রবিজা খাতুন। তাঁর কাঁপা হাত বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল নাতি মোহাম্মদ রায়হানের নিথর মুখ। যে নাতিকে কোলেপিঠে করে বড় করেছেন, হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গেছেন, বিদেশ পাঠাতে নিজের শেষ সম্বলটুকুও খরচ করেছেন, সেই নাতিই আজ সাদা কাফনে মোড়ানো।
উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ছোট ছিলোনিয়া গ্রামের বাড়িটিতে শুক্রবার বিকেল থেকেই নেমে আসে শোকের মাতম। ওমান প্রবাসী যুবক মোহাম্মদ রায়হান আর ফিরবেন না, এই সত্য যেন কেউই মেনে নিতে পারছিল না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, রায়হানের মা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। মায়ের মুখ দেখতেই মাস খানিক আগে ওমান থেকে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, এবার দেশে এসে সংসার শুরু করবেন রায়হান। সেই প্রস্তুতিও চলছিল ঘরেজুড়ে। নতুন বউকে ঘরে তোলার আশায় বাড়ির দেয়ালে রঙের কাজ হচ্ছিল। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তাও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু নিয়তি যেন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।
শুক্রবার সকালে বন্ধুদের সঙ্গে সীতাকুণ্ডে বেড়াতে যান রায়হান। জুমার নামাজ আদায়ের জন্য সীতাকুণ্ডের গফুর শাহ জামে মসজিদের দিকে মোটরসাইকেলে রওনা হন। নামাজে যাওয়ার সেই পথই হয়ে ওঠে জীবনের শেষ যাত্রা। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কবলে পড়লে গুরুতর আহত হন তিনি। স্থানীয় লোকজন দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
খবরটি গ্রামে পৌঁছানোর পর থেকেই যেন স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকা। রায়হানের ফুফাতো ভাই আলমগীর বলেন, প্রবাসে থেকে কত কষ্ট করছে। পরিবারের জন্য নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়েছে। মামি অসুস্থ হওয়ার পর সব ফেলে দেশে চলে আসছে। আমরা ভাবছিলাম, এবার ওর সংসার হবে। কিন্তু আল্লাহ ওরে এভাবে নিয়ে যাবে, কখনো ভাবিনি।
নিহতের মামাতো ভাই তারেকুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভদ্র ও দায়িত্ববান ছিলেন রায়হান। পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বিদেশে থেকেও নিয়মিত বাড়িতে খোঁজখবর নিতেন। দাদীর ওষুধ থেকে শুরু করে পরিবারের ছোট-বড় সব প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করতেন।
শতবর্ষী রবিজা খাতুনের চোখে এখন শুধু নাতির শৈশবের স্মৃতি। কখনো বলছেন, “আঁর রায়হান ইস্কুলত ন যাইত, আঁই হাত ধরি ধরি লই যাইতাম। কখনো আবার নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছেন, বিদেশত্তুন আইচ্ছি নাতি, আঁই কইলাম যে বউ আইন্নুম। হাইরে নাতি বউ আঁর আনিত নপাইল্লাম।”
ঘরের এক কোণে পড়ে আছে রঙের বালতি আর তুলি। অসমাপ্ত দেয়াল যেন সাক্ষী হয়ে আছে একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের।
স্থানীয়রা বলেন, একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন তরুণের প্রাণই কেড়ে নেয়নি; কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একজন মায়ের শেষ ভরসা আর এক শতবর্ষী দাদীর বেঁচে থাকার শেষ আনন্দটুকুও।



