চট্টগ্রামের পাহাড়-টিলা ও সমতল বেষ্টিত উপজেলা ফটিকছড়ি। যেখানে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্ট বন্যায় ডুবে যায় উপজেলার অধিকাংশ অঞ্চল। এতে হাজার হাজার কৃষকের সোনালি ধান, বীজতলা পচে পানির নিচে। পানিতে ভেসে যায় বিভিন্ন পুকুর ও প্রজেক্টের কোটি টাকার মাছ। চট্টগ্রাম- খাগড়াছড়ি ও গহিরা-হেঁয়াকো আঞ্চলিক মহাসড়কসহ স্থানীয় সড়কগুলোতে হয় কোমর পানি। এই আকস্মিক জলাবদ্ধতাই পরিচিতি পায় ‘ফটিকছড়ির দুঃখ’ হিসেবে। সর্বশেষ গত ২০২৪’এর ফটিকছড়ির ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ৪৭৬ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এসময় পানিবন্দি হয়ে পড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। এবার সেই দুঃখ ঘুছবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) খাল খনন প্রকল্পে। জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাষিদের লোকসান লাঘব, অনাবাদি জমি সেচের আওতায় আনাসহ বহুমুখী লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দুর হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সুত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ভ‚-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ এই দুই অর্থবছরে ফটিকছড়ি উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নে ৩৩ কিলোমিটারের অধিক খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। পুনঃখননকৃত খালগুলো হল- পাইন্দং ইউনিয়নের পাইন্দং খাল ও পাটিয়ালছড়ি খাল, দাঁতমারা ইউনিয়নের দাঁতমারা খাল ও করালিয়া ছড়া, ভুজপুর ইউনিয়নের হরিণা খাল, সমিতিরহাট ইউনিয়নের হিন্দুনীছড়া, মরা হালদা ছড়া, হিন্দুনী ছড়া শাখা খাল, জাফতনগর ইউনিয়নের বোলার মা খাল, হেরগাজী খাল ও খনখাইয়া খাল, বক্তপুর ইউনিয়নের ইছাছড়া খাল, ধর্মপুর ইউনিয়নের খনখাইয়া খাল। যা খননকাজ এখনো চলমান।
ভূজপুরের কৃষক নুরুল আলম বলেন, হরিণা খালটি দীর্ঘদিন অকেজো ছিল, কৃষকদের কোনো কাজে আসতো না। বরং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। খালটি পুনঃখনন হওয়ায় এখন হয়তো আমাদের ভাগ্য বদলাবে।
ধর্মপুরের কৃষক মহিউদ্দিন বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। তারপর রয়েছে পাহাড়ি ঢল আতঙ্ক। এবার মরা খনখাইয়া খালটি খনন করছে বিএডিসি। আশা করছি এবার এই খাল অত্রাঞ্চলে জলাব্ধতা দুর হবে এবং কৃষকের মুখে হাসি ফুটাবে।’
পাইন্দং ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর জব্বর বলেন, ‘নতুন করে খাল পুনঃখনন করায় চাষিরা আগ্রহী হচ্ছে। আশা করি বিলের পর বিল অনাবাদি জমি আর পড়ে থাকবে না। সব জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে।’
উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি সোলাইমান আকাশ বলেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি স্থানীয় পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি পরিবেশও এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় এসেছে। এ উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হওয়া দরকার।’
বিএডিসির উপ-সহকারী কর্মকর্তা দীপন চাকমা জানান, ‘স্থানীয়দের দুর্ভোগের কথা ভেবে খাল পুনঃখননে একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিএডিসি। আমরা ইতিমধ্যে উপজেলা বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ১৩ টি খাল পুনঃখনন করেছি। আরও বেশ কয়েকটি খাল পুনঃখননের প্রস্তাব রয়েছে। ধাপে ধাপে কাজ সম্পন্ন হলে কৃষি উৎপাদন ও জলাবদ্ধতা দুটোই নিশ্চিত হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সালেক জানান, প্রতিবছর পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে ফটিকছড়িতে ব্যাপক ক্ষতি হয় কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে। জলাবদ্ধতা থেকে সুরক্ষা এবং ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিএডিসি একটি যুগান্তকারী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ফটিকছড়িতে। এর ফলে এলাকাবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবেন এবং চাষিরা উৎপাদিত ফসল সুরক্ষা ও অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনার মাধ্যমে লাভবান হবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘বিএডিসি ইতিমধ্যে উপজেলা বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ১৩ টি খাল পুনঃখননের কাজ শেষ করেছে। এর ফলে খালের পানি ধারণক্ষমতা বাড়বে, হালদা নদীর জোয়ারের পানি খালের বিভিন্ন প্রান্তে ঢুকবে, শুষ্ক মৌসুমে চাষিরা সেচ দিতে পারবে আবার বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার হাত থেকে ফসল রক্ষা পাবে কৃষকরা। আশাকরি প্রকল্পটির মাধ্যমে চাষির মুখে হাসি ফুটবে।’



