আজ ২১ নভেম্বর, ফটিকছড়ি গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঈদের আনন্দের মধ্যেই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার লেলাং ও কাঞ্চননগর এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে সেদিনের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমিগুলো।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অভিযোগ, উপজেলায় প্রায় এক ডজন বধ্যভূমি থাকলেও মাত্র তিনটি ছাড়া বাকিগুলো অরক্ষিত ও অবহেলিত। দিবসটি পালনেও প্রশাসন বা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর ছিল ঈদুল ফিতরের দিন। ঈদের নামাজ শেষে মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ যখন উৎসবে মেতেছিল, ঠিক তখনই হানা দেয় পাকিস্তানি বাহিনী ও স্থানীয় রাজাকাররা। তারা লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর নাথপাড়াসহ আশপাশের এলাকা ঘেরাও করে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ করতে থাকে। খবর না পেয়ে তারা চালায় লুটপাট, নির্যাতন ও গণধর্ষণ। এরপর বেছে বেছে ১৭ পরিবারের ২৯ জন বাঙালিকে পাশের ছড়ার কূলে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।
সেদিনের সেই বর্বর হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন মো. জহুরুল ইসলাম, মো. ইউনুছ, মো. জমিল উদ্দিন, নুর মোহাম্মদ, মো. এয়াকুব, মো. নুরুল আলম, তোফায়েল আহম্মদ, রুহুল আমিন, ফয়েজ আহমেদ, জাগের আহমেদ, আবছার আহম্মদ, নুরুল ইসলাম, চিকন মিয়া, জহুর আহম্মদ, ইদ্রিস, সোলাইমান, রফিকুল আলম, বজল আহম্মদ। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে শহীদ হন ক্ষেমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য্য, রমেশ চন্দ্র নাথ, কৃষ্ণ হরি নাথ, শুধাংশু বিমল নাথ, হরিপদ নাথ, হরি লাল নাথ, বিপিন চন্দ্র নাথ, সুবেন্দ্র লাল নাথ, হরিধন নাথ, নগর বাঁশি নাথ ও গৌর হরি নাথ।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুরেন্দ্র দেব নাথের ছেলে পাঁচ কড়ি নাথ, গৌর হরি নাথের ছেলে অনিব চন্দ্র নাথ ও হরি লাল নাথের স্ত্রী সুমতি বালা নাথ বলেন, একাত্তরের সেই দিনে শত শত নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। স্বাধীনতার এত বছর পরও নিহতরা শহীদের মর্যাদা পাননি। সরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই অনাহারে-অর্ধহারে দিন কাটছে শহীদ পরিবারগুলোর।
একই দিন ফটিকছড়ির সীমান্তবর্তী কাঞ্চননগর ইউনিয়নেও হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। রাজাকারদের সহায়তায় তৎকালীন স্নাতক পাস যুবক হেদায়তুল ইসলাম চৌধুরী এবং অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবককে রক্তছড়ি খালের পাড়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। এরপর দক্ষিণ কাঞ্চনপুর গোমস্তা পুকুর পাড়ে নিরীহ ৯ বাঙালিকে এক রশিতে বেঁধে গুলি করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আহমেদ হোসেন ও বদিউল আলম নামের দুজন।
এখানে শহীদরা হলেন—নুরুল আলম, ভোলা, বানু হোসেন, ভোলা ওরফে ভোলাইয়্যা, জেবল হোসেন, ইসলাম ও কালা মিয়া।
ফটিকছড়ির প্রবীণ সাংবাদিক আবুল বশর বলেন, গণমাধ্যমে লেখালেখির পর ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ার লেলাং বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছিলেন। সেটি ভেঙে পড়ার পর জেলা পরিষদ সেখানে নতুন স্মৃতিসৌধ করে। এছাড়া কাঞ্চননগরেও জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি স্মৃতিসৌধ করা হয়েছে। তবে গণহত্যা দিবসটিতে কোনো আনুষ্ঠানিকতা না থাকায় নতুন প্রজন্ম এই ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারছে না।
এ বিষয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রীয় দিবসগুলো উপজেলা প্রশাসন উদযাপন করে থাকে। গণহত্যা দিবসের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বা কোনো সংগঠন উদ্যোগ নিলে প্রশাসন সহযোগিতা করবে।



