১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর আব্দুর রহমান বিশ্বাস প্রথম পূর্ণ মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর বঙ্গভবনে অবস্থানকালে তিনি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ গ্রামে (বর্তমান আগৈলঝাড়া উপজেলা) এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। গ্রামীণ সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা আব্দুর রহমান স্থানীয় স্কুল থেকে প্রাথমিক পাঠ শেষ করে বরিশাল শহরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি আইন বিষয়ে (এলএলবি) ডিগ্রি পান। এই সুদৃঢ় শিক্ষাগত ভিত্তি তার আইনজীবী জীবন ও পরবর্তী রাজনৈতিক রূপরেখা গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সংসদীয় সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করেন তিনি। সত্তরের দশকের শেষভাগে স্থানীয় সরকার প্রশাসনে যুক্ত হয়ে ১৯৭৭ সালে বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে মোটামুটি দীর্ঘ সময় কাজ করেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পরিচিত হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি মূলধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শামিল হন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে ফেরেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য হন এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেন। স্পিকারের আসনে থেকে সংসদীয় শালীনতা বজায় রাখা ও আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন।
১৯৯১ সালের অক্টোবরে আব্দুর রহমান বিশ্বাস বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ণ পাঁচ বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের প্রশাসনিক ক্ষমতা বেশ সীমিত থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ধরে রাখতে তিনি আন্তরিক সচেষ্ট ছিলেন।
তার মেয়াদের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক সফরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মহাথির বিন মোহাম্মদ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী এবং ভুটানের রাজার মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার কূটনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। ১৯৯৬ সালে নিজের মেয়াদ সফলভাবে পূর্ণ করার পর তিনি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন শান্ত স্বভাবের ও বইপ্রেমী মানুষ; রাষ্ট্রপতি থাকাকালেও নিয়মিত অধ্যয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সময় কাটাতেন। দীর্ঘ ও কর্মময় জীবনের অধিকারী এই সাবেক রাষ্ট্রপতি ২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯১ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী জিলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে নীতি ও নিয়মের মধ্যে থেকে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে আব্দুর রহমান বিশ্বাস এক অনন্য কিন্তু স্বকীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য হন।
লেখক: শিক্ষাবিদ।



