মতবিরোধ নিয়েই হেফাজত আমিরের ডাকে কাল ফটিকছড়িতে বৈঠকে বসছেন ৭ ইসলামী দল

ন্যাশনাল ডেস্ক

হেফাজতে ইসলামের বৃহত্তর ঐক্যের ডাকে সাড়া দিয়ে বৈঠকে বসছে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সাত রাজনৈতিক দল। নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ নিয়েই রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামে বসছেন দলগুলোর নেতারা।

হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় এই বৈঠক হবে। সাত দলের পাঁচজন করে ৩৫ প্রতিনিধি এতে অংশ নেবেন। থাকবেন হেফাজতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। খবর এশিয়া পোস্টের।

এর আগে, হেফাজতের কাছে পরস্পরবিরোধী প্রস্তাবনা জমা দেয় সাত দল। দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই। তবে এর রূপরেখা কেমন হবে তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।

কোনো দল অন্য রাজনৈতিক জোটে থেকেই সাত দলের সঙ্গে কাজ করতে চায়। আবার কারও দাবি, নতুন প্ল্যাটফর্মে থাকতে হলে আগে অন্য জোট ছাড়তে হবে।

সাত দলের ঐক্যের জন্য জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া জরুরি নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ গত আগস্টে বলেছিলেন, ‘কওমি দলগুলোর জোট জামায়াতসহ ১১ দলের ঐক্যে প্রভাব ফেলবে না।’ অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত কারও সঙ্গে জোট গঠনে আপত্তি রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের।

ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফও সম্প্রতি বলেছেন, ‘কোনো দল জামায়াত জোটে থাকবে, আবার সাত দলেও থাকবে; এটা হবে না। ইসলামী আন্দোলন এমন কারও সঙ্গে জোট করবে না, যারা দুই দিকেই আছে।’

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন হেফাজত আমির

সাত দলের ঐক্যের সমন্বিত রূপরেখা নিয়ে রোববারের বৈঠক থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সকালে হেফাজত আমির প্রস্তাবনা পর্যালোচনাবিষয়ক সাব-কমিটির সঙ্গে রূপরেখা নিয়ে বৈঠক করবেন। সকাল ১০টায় সাত দলের প্রতিনিধিদের সামনে এটি উপস্থাপন করা হবে। পরে সবার মতামতের ভিত্তিতে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘কাল সকালে বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাব কমিটির বৈঠক হবে। এরপর সাত দলের পাঁচজন করে ৩৫ জন নেতা তার সঙ্গে বৈঠক করবেন। ঐক্যের বিষয়ে আমরা আশাবাদী। হেফাজত আমিরের কথা কেউ ফেলবেন বলে মনে হয় না।’

ঐক্যের বিষয়ে রোববারই কি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে? এমন প্রশ্নে আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কোনো দল যদি ঐক্যে ফাটল ধরাতে চায়, তাহলে সবাই মিলে একটা সুন্দর ও শৃঙ্খলাপন্থি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজনে কাউকে বাদ রেখে ঐক্য করা হবে কি না, এ বিষয়ে মুরুব্বিরা সিদ্ধান্ত নেবেন।’

ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘আমাদের দল থেকে মহাসচিবসহ পাঁচজন প্রতিনিধি বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন। ঐক্যের জন্য সর্বোচ্চ ছাড় দেব আমরা। সমঝোতায় প্রাধান্য রেখে আমাদের আলোচনা এগিয়ে যাবে।’

অন্য জোটের সঙ্গে থাকা কারও সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন জোট করবে না। আগে দেওয়া এমন শর্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওটা আমাদের স্ট্যান্ডার্ড পজিশন। একই সঙ্গে তো দুই জায়গায় সংসার হয় না। কিন্তু সমঝোতার সময় কোনো শর্ত দিচ্ছি না আমরা। এক প্ল্যাটফর্মে আসাই আমাদের লক্ষ্য।’

হেফাজত আমিরের ডাকা বৈঠকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রতিনিধি দল থাকবে বলে জানান দলের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীন। তিনি বলেন, ‘ইসলামি দলগুলোর ঐক্যের বিষয়ে আমাদের অবস্থান ইতিবাচক। কে কোন প্রস্তাব দিয়েছে সেটা বড় বিষয় নয়। ঐক্যে আগ্রহ থাকাটাই বড় বিষয়।’

ভিন্ন রাজনৈতিক জোটে থেকে ইসলামি দলগুলোর ঐক্য বাংলাদেশে নতুন নয়। এবারও সেই ধারা অনুসরণ করতে চায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। আতাউল্লাহ আমীন জানান, ১১ দলে থেকেই সাত দলের ঐক্যে অংশ নিতে চায় তার দল।

গত ১৬ জুলাই সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে জোট গঠনের উদ্যোগ নেয় হেফাজত। মূলত জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে ইসলামপন্থিদের স্বতন্ত্র একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এর অংশ হিসেবে দলগুলোকে হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর কাছে ৩ আগস্টের মধ্যে জোট গঠনের প্রস্তাবনা জমা দিতে বলা হয়।

ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা সাতটি দল হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং নেজামে ইসলাম পার্টি।

কী আছে দলগুলোর প্রস্তাবনায়

রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সাত দলের ঐক্য চায় ইসলামী আন্দোলন। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়াসহ অন্য রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে আলাদা সমঝোতা না করতে আগ্রহী দলটি। রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তে প্রতিটি দলের নিজস্ব পছন্দ ও মতকেই প্রাধান্য দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। ১১ দলীয় জোটেই থেকেই সাত দলের সঙ্গে ঐক্য করতে চায় দলটি। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে মাঠে সক্রিয় থাকার কথাও আছে দলটির প্রস্তাবনায়।

আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের নীতি ও আদর্শের ওপর দৃঢ় থাকাকেই জোর দিচ্ছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটি চান, একটি বিশেষ ফোরামের মাধ্যমে ঐক্যের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এদিকে ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা দলগুলো অন্য কোনো জোটে না থাকার পক্ষে মত দিয়েছে খেলাফত মজলিস। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নেও দলগুলোর ঐক্য চাইছে।

আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকিদাকে ঐক্যের মূল ভিত্তি রাখার প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামী ঐক্যজোট। দলটির মতে, এর ওপরই ভিত্তি করে জোটে দলগুলোর থাকা না থাকা নির্ভর করবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন চায়, নতুন জোটের তত্ত্বাবধায়ক হোক হেফাজতে ইসলাম। সাত দল পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মজলিসে শুরা গঠন করার প্রস্তাবনা দিয়েছে দলটি। তারাও চায়, সাত দলের কেউ অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে না থাকুক। এছাড়া বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি প্রস্তাবনায় জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে মাঠে সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছে।

হেফাজত আমির কি নেতৃত্বে থাকবেন

হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে ইসলামি দলের জোট হলেও জোটের নেতৃত্বে তিনি থাকছেন না। হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘প্রতিটি দলেরই নিজস্ব মতামত আছে। তারা কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও ঐক্যের চেষ্টা করবেন। সাতটি দলের নেতৃত্বে কারা থাকবেন, এখনই বলা যাচ্ছে না। এটা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। তবে হেফাজতের আমির রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে থাকবেন না। রাজনৈতিক দলের নেতারাই সেখানে নেতৃত্বে দেবেন। তিনি তাদের দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেবেন।’

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?