কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের ঐক্যপ্রক্রিয়ায় নতুন অগ্রগতি হয়েছে। ঐক্যের খসড়া রূপরেখা নিয়ে ফটিকছড়িতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সব বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য না হলেও পরবর্তী আলোচনা ও সমন্বয়ের জন্য ২২ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় এ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
রোববার ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে সাত দলের ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
বৈঠকে সাত দলের ঐক্যের সম্ভাব্য কাঠামো, সমন্বিত কর্মপদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কার্যক্রমের খসড়া রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি দলের দেওয়া পৃথক প্রস্তাব পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বৈঠকে সেটি সাত দলের প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তবে, খসড়া রূপরেখার সব বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়ায় বিষয়গুলো নিয়ে আরও আলোচনা ও সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এর অংশ হিসেবে সাতটি দল থেকে তিনজন করে সদস্য নিয়ে হেফাজতের একজনসহ ২২ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মুফতি জসীমউদ্দিন বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের আলেমসমাজ ও সর্বস্তরের মুসলিম উম্মাহর আকাঙ্ক্ষা- ইসলামপন্থী দলগুলো একটি প্ল্যাটফর্মে থেকে একসঙ্গে কাজ করবে। এ লক্ষ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি ফর্মুলা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রত্যেক দল তাদের নিজস্ব প্রস্তাব দিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির সেসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন। রোববারের বৈঠকে প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। আমিরের পরামর্শে তৈরি করা খসড়া রূপরেখা সাত দলের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মুফতি জসীমউদ্দিন জানান, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানের নেতৃত্বে সাত দল থেকে তিনজন করে সদস্য নিয়ে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে খসড়া রূপরেখা নিয়ে আরও আলোচনা ও সমন্বয় করা হবে।
বৈঠককে কেন্দ্র করে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রতিনিধিদের গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলে বৈঠক শেষে কোন প্রতিনিধি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। পরে মুফতি জসীমউদ্দিন বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
বৈঠকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান, সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা খলিল আহমদ কাসেমী, নায়েবে আমির মুফতি জসীমউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ ও নায়েবে আমির মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজী এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজীসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যুক্ত সাতটি দল হলো—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
কওমি ঘরানার ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যপ্রক্রিয়া শুরু হয় গত ১৬ জুলাই। ওই দিন ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাত দলের শীর্ষ নেতারা ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হন।
এরপর প্রতিটি দলকে নিজস্ব প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য ৩ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের জন্য হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।
হেফাজতে ইসলাম সূত্র জানায়, ১৬ জুলাইয়ের পর উপকমিটি অন্তত তিনবার বৈঠক করেছে। এর মধ্যে দুবার ঢাকায় এবং একবার চট্টগ্রামে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ১ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দলগুলোর পৃথক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে একটি সমন্বিত খসড়া রূপরেখা তৈরির কাজ শেষ করা হয়।
রোববারের বৈঠকে ওই সমন্বিত খসড়া রূপরেখা সাত দলের প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তবে সব বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় পরবর্তী আলোচনা ও সমন্বয়ের জন্য লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় কমিটির বৈঠকে খসড়া রূপরেখা নিয়ে আরও আলোচনা হবে।



