সাইকেলটির বয়স এখন ২৬ বছর। পুরোনো হয়ে গেছে রং, ক্ষয়ে গেছে বিভিন্ন অংশ। তবু সকাল হলেই সেটির প্যাডেলে পা রাখেন সুনীল চন্দ্র ধর। একসময় যে সাইকেলটি ঋণ করে সাড়ে তিন হাজার টাকায় কিনেছিলেন, সেটিই আজও তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে পুরোনো ও বিশ্বস্ত সঙ্গী। বয়স এখন ৫৮। আগের মতো দ্রুত সাইকেল চালাতে পারেন না। শরীরও সবসময় সায় দেয় না। তবু প্রতিদিন প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ডাক বিলি করেন তিনি। রোদ হোক কিংবা বৃষ্টি—ঠিকানার মানুষটির হাতে ডাক পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছেদ পড়ে না।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুয়াবিল ইউনিয়নের বারোমাসিয়া গ্রামের যতীস চন্দ্র ধরের ছেলে সুনীল। ১৯৯৬ সালে নাজিরহাট উপ ডাকঘরে ডাকপিয়ন হিসেবে যোগ দেন। তার আগে জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল কৃষিকাজ। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে মানুষের হাতে চিঠি, নথি আর খবর পৌঁছে দেওয়াই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের নিয়মিত কাজ।
এক সাইকেলে কেটে গেছে ২৬ বছর:
এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে মানুষের যোগাযোগের ধরন। বদলে গেছে ডাকপিয়নের ব্যাগও। একসময় যে ব্যাগে থাকত অসংখ্য ব্যক্তিগত চিঠি, প্রিয়জনের খবর কিংবা দূর শহর থেকে আসা ভালোবাসার বার্তা, এখন সেখানে বেশি থাকে সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র, আদালতের আদেশ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক চিঠি ও আইনি নোটিশ। সুনীল বলেন, “ইদানীং বেশি আসছে বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ ও তালাকনামা।”
সুনীলের চোখে সবচেয়ে বেশি বদল এসেছে চিঠির আবেগে।
পুরোনো দিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, “আগে আমরা যখন চিঠিপত্র নিয়ে মানুষের বাড়িতে যেতাম, তখন আমাদের দেখলেই মানুষ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসত। কার চিঠি এসেছে, কোথা থেকে এসেছে—জানার জন্য অপেক্ষা করত। চিঠি হাতে পাওয়ার পর মানুষের মুখের যে আনন্দ দেখতাম, তা এখনো মনে পড়ে।”
সেই সময়ের চিঠির গল্পও তাঁর স্মৃতিতে স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, “আগে ডাকের ব্যাগে প্রেমপত্র আসত, প্রিয়জনের চিঠি আসত। চিঠির জন্য মানুষ অপেক্ষা করত, চিঠি হাতে পেয়ে আনন্দও করত। এখন সেই চিঠি খুব একটা আসে না।”
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে সেই অপেক্ষার দিনও অনেকটা ফুরিয়েছে। মুঠোফোন, খুদে বার্তা ও ইন্টারনেটের যুগে মুহূর্তেই এক প্রান্তের খবর পৌঁছে যায় অন্য প্রান্তে। ফলে ডাকপিয়নের ব্যাগে ব্যক্তিগত চিঠির জায়গা দখল করেছে দাপ্তরিক কাগজপত্র। একসময় খাকি খাম মানেই ছিল অপেক্ষা, আনন্দ কিংবা প্রিয়জনের খবর। এখন সেই খামেই কখনো আসে বিচ্ছেদের বার্তা। সুনীলের কর্মজীবনে এ পরিবর্তন যেন সময় বদলের এক নীরব দলিল।
তবু বদলে যাওয়া ডাকের এই সময়ে থামেনি সুনীলের সাইকেল।
প্রতিদিন পুরোনো পনিক্স সাইকেলটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মানুষের হাতে পৌঁছে দেন ডাক। কাজ শেষে সন্ধ্যায় সেই সাইকেলেই ফেরেন বাড়িতে। বয়স বেড়েছে, প্যাডেলের গতি কমেছে; কিন্তু দায়িত্ব পালনের অভ্যাসে যেন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
চাকরির পাশাপাশি কৃষির সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রেখেছেন সুনীল। কাজের ফাঁকে কিংবা ছুটির দিনে ছেলের সঙ্গে মাঠে নামেন। ডাক বিলি করা তাঁর পেশা, আর কৃষিকাজ তাঁর পুরোনো জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা আরেক পরিচয়।
২৮ বছরের কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে অবশ্য আর্থিক স্বচ্ছলতার গল্প বলতে পারেন না তিনি। ডাক দিবসের প্রসঙ্গ উঠতেই কণ্ঠে ফুটে ওঠে আক্ষেপ।
সুনীল বলেন, “দিবস আসে, দিবস যায়। কিন্তু আমাদের ভাগ্য তো পাল্টায় না। আমরা যে বেতন পাই, তাতে সংসার চালানো কঠিন। তারপরও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে এই পদটি আঁকড়ে ধরে আছি।”
তিনি আরও বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে আমরা যে বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছি। সরকারের কাছে আমাদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎসব বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানাই।”
চিঠির যুগ বদলে গেছে। মানুষের অপেক্ষার ধরন বদলেছে। বদলে গেছে ডাকপিয়নের ব্যাগে থাকা কাগজের গল্পও। কিন্তু ফটিকছড়ির পথে সুনীল চন্দ্র ধরের সেই পুরোনো পনিক্স সাইকেলটি এখনো ঘুরছে।
সেই চাকার প্রতিটি ঘূর্ণনে যেন লেখা আছে ২৮ বছরের কর্মজীবনের গল্প—একজন ডাকপিয়নের গল্প, খাকি খামের গল্প, মানুষের অপেক্ষার গল্প; আর হারিয়ে যেতে বসা চিঠির যুগের এক জীবন্ত স্মৃতি।
৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস। এই দিনে সুনীলের মতো ডাকপিয়নদের গল্প মনে করিয়ে দেয়—যোগাযোগের মাধ্যম বদলালেও মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি এখনো কারও না কারও কাঁধেই থাকে।



