ফপ্র- সারথি:
নাম তাঁর ফিরোজা বেগম । বয়স ৫৮ ছুঁই ছুঁই। কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীন বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু নানা কারণে আর স্বামীর সংসার করা সম্ভব হয় নি তাঁর। ফিরে আসেন বাপের বাড়ি। এই আঘাতই বদলে দিয়েছে জীবন। শুরু হয়েছে মানব সেবার নতুন এক অধ্যায়ের। যৌবনের প্রথম প্রহরে পারিবারিক এমন ধাক্কার তিক্ত অভিজ্ঞতায় আর বিয়ে কিংবা সংসারে চিন্তা মাথায় আসেনি তাঁর। বাপের বাড়ি ফিরে মনস্থির করলেন সমাজ সেবায় বিলিয়ে দেবেন নিজেকে। সেই বাল্যকাল থেকে দরিদ্রতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, লড়েছেন এবং জয় করেছেন। তাঁর অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে সব প্রতিকূলতা। সাধারন জীবন যাপনে অভ্যস্ত ফিরোজা বেগম টানা ৩৩ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন জনপ্রতিনিধির। স্থানীয় বাসিন্দারাও মন খোলে কথা বলতে পারে তাঁর সাথে। পথে ঘাটে অফিসে যে যেখানে সেবা নিতে আসে সাধ্যমতে সেবা দিতে চেষ্টা করেন তিনি। ভাইয়ের দোকানের অফিসে বসে রাত পর্যন্ত এলাকাবাসীকে সেবা দিতে দেখা যায়। স্থানীয়দের কাছে তার কথা তুলে ধরলেই এক বাক্যে বলে ওঠেন- তাঁর (ফিরোজা) মতো জনপ্রতিনিধি হয় না, তাকে সবসময় আমরা পাশে পাই।
ফিরোজা বেগম চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সাবেক ধুরুং ইউপির (বর্তমান ফটিকছড়ি পৌরসভা) এ-ওয়ার্ডের নূর আহমদ সুফি বাড়ির মৃত রশিদ আহমদ সওদাগর ও রশিদা খাতুন দম্পতির মেয়ে। ১৯৮৭ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরে চাকরি নিয়ে প্রথমে একটি মাতৃকেন্দ্রের সম্পাদক ও পরে মাঠকর্মীর দায়িত্ব পালন করেন। এক সময় তার মাথায় আসলো জনগনের বৃহৎ সেবা করতে হলে জনপ্রতিনিধি হতে হবে। পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদ সৃষ্টি হলে এলাকার লোকদের চাপে ধুরং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ‘এ’ ওয়ার্ডে (১,২,৩ ওয়ার্ড) সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রার্থী হন। ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথমবারের ওই নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গোলাপ ফুল মার্কা প্রতীকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন । এরপর থেকে কখনো হারতে হয়নি তাকে। সেই থেকে চারবার ইউপি সংরক্ষিত সদস্য ও ফটিকছড়ি পৌরসভা ৭,৮ ও ৯ নং ওয়ার্ড থেকে তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। সেই থেকেই শুরু, এখনো ওই একই ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর হিসেবে জনগণের সেবা করে চলেছেন তিনি।
পাশাপাশি তিনি ফটিকছড়ি পৌরসভার তৃতীয়বারের মতো প্যানেল মেয়রের দায়িত্বও পালন করেন। এছাড়া তিনি ধুরুং কে এম টেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি, আনোয়ার আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য, ফটিকছড়ি উপজেলা আইনশৃংঙ্খলা কমিটির সাবেক সদস্য, ফটিকছড়ি থানা মহিলা মেম্বার সমিতির সাবেক আহ্বায়ক, উপজেলা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য, ফটিকছড়ি উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ফটিকছড়ি পৌরসভা কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সভাপতি, ফটিকছড়ি ক্রীড়া সংস্থার নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে চলা এই নারী ২০২৩ সালে জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রমের আওতায় সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় উপজেলা পর্যায়ে পেয়েছেন জয়িতা সম্মাননা পুরষ্কারও। এছাড়াও পেয়ে সরকারী-বেসরকারী নানান সম্মান স্মারকও।
ফিরোজা বেগমের ভাই মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, জনগনকে সেবা দিতে আপাকে কোনদিন অবহেলা করতে দেখিনি। যে কোন দুর্যোগেও ছুটে যান তিনি। এলাকাবাসীর খবরাখবর নেন। সাধ্যমতে সহযোগীতা করেন। আমাদের পুরো পরিবারকে তিনি এলাকাবাসীর সেবার কাজে ব্যবহার করান।
সমাজসেবা ও জনপ্রতিনিধির দীর্ঘ যাত্রায় অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতাকেও মুকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। স্কুটি চালিয়ে জনপদের খবরাখবর ও রাস্তা মেরামতের কাজ দেখবাল করতে গিয়ে পড়তে হয়েছে বিভিন্ন জনের কটু কথা, তাচ্ছিল্যতার। রক্ষণশীল সমাজের তোপের মুখেও পড়তে হয়েছে বহুবার। কিন্তু কোনো কিছুকে পরোয়া না করে তিনি একাগ্রতায় কাজ করে গিয়েছেন জনগণের সেবায়। তার এই দীর্ঘ যাত্রায় সব সময় পাশে পেয়েছেন পরিবারকে।
সংসার ও সুন্দর জীবনের চিন্তা বাদ দিয়ে কেন নিজেকে মানবসেবায় বিলিয়ে দিয়েছেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, তাঁর এমন সংকল্প ও কর্ম প্রেরণার মূল হলেন মাদার তেরেসা ও প্রিন্সেস ডায়ানা। তিনি সমাজকর্মে এই দুইজনকে অনুসরণ করতেন ও করে যাচ্ছেন। দেশ ও দশের জন্য্র আজীবন কাজ করার কথা জানালেন তিনি। তিনি বলেন, ‘মানুষের জন্য কিছু করতে পারার মধ্যে আতœতৃপ্তি আছে। সেভাবে মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই।’



