৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সৌভাগ্যের শবেবরাত

মাওলানা দৌলত আলী খান

বছরের পাঁচটি পূর্ণময় রাতের মধ্যে শবেবরাত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত। এ রাতে গোনাহগার বান্দারা মহান আল্লাহর দরবার হতে ক্ষমা লাভ করে থাকে। তবে এ ক্ষমা লাভের জন্য রাত জেগে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে হবে। ভবিষ্যতে অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত থাকার শপথ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় গোনাহও ক্ষমা হবে না এবং তওবাও কবুল হবে না। শবেবরাত পাপ মুক্তির রজনী, সৌভাগ্যের রজনী। এ রাতের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা এ রাতে বান্দাদেরকে রিজিক, গোনাহ ক্ষমা ও বিপদ থেকে মুক্তির জন্য প্রথম আসমানে এসে সরাসরি ডাকতে থাকেন। এ প্রসঙ্গে হজরত নবী করিম (সা.) বলেন, যখন শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত (শবেবরাত) আসবে, তখন তোমরা জাগ্রত থেকে আল্লাহ তায়ালার বন্দেগি করবে এবং পরবর্তী দিবসে রোজা রাখবে। কেননা, ওই রাতে সূর্যাস্তের পরক্ষণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রথম আসমানে আসেন এবং বান্দাদেরকে ডেকে বলেন, ক্ষমা প্রার্থনাকারী কেউ আছে কি? তাকে আমি ক্ষমা করবো। রিজিক প্রার্থনাকারী কেউ আছে কি? তাকে আমি রিজিক দিবো। বিপদগ্রস্থ কেউ আছে কি? যে বিপদ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করবে? আমি তার বিপদ দূর করে দিবো। এভাবে ফজর পর্যন্ত ডাকতে থাকেন। (ইবনে মাজাহ : ১৪৫১)


হাদিসে আরও আছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাতে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে পাই নি। তালাশ করতে বের হয়ে দেখলাম, তিনি “বাকি” নামক কবরস্থানে আছেন। আমাকে দেখে বললেন, আয়েশা! তুমি কি মনে করেছ যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল তোমার প্রতি অবিচার করেন? আয়েশা বলেন, আমি বললাম, হে রাসুলুল্লাহ! সত্যিই আমি ধারণা করছিলাম যে, আপনি আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর ঘরে গেছেন। তখন হুজুর (সা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে এই নিকটতম আসমানে অবতীর্ণ হন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশম সংখ্যারও অধিক ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন- আজ সেই রাত। (তিরমিজি : ৭৪৪; ইবনে মাজাহ : ১৪৫২)


শবেবরাতে যদি খাঁটি অন্তরে বিশুদ্ধভাবে মহান আল্লাহর দরবারে তওবার মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে গোনাহ মাফের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি বছর শবেবরাত ঈমানদারের স্বীয় অপরাধ মোচন করার জন্য ফিরে আসে। এটা বান্দার প্রতি আল্লাহ তায়ালার অশেষ করুণা। কিন্তু দশ প্রকারের ব্যক্তিকে এ রাতে ক্ষমা করা হবে না। এ প্রসঙ্গে হজরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, দশ শ্রেণির মানুষ এ বরকতময় রাতে বিশেষ ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকবেÑ ১. মুশরিক ২. হিংসুক বা বেদয়াতী ব্যক্তি, ৩. রক্তের সম্পর্কীয় আত্মীয়তা ছিন্নকারী, ৪. যে পুরুষ অহংকার বশতঃ পায়ের গোড়ালী ঢেকে কাপড় পরে থাকে, ৫. পিতামাতার অবাধ্য সন্তান বা স্বামীর অবাধ্য স্ত্রী, ৬. মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি, ৭. অন্যায়ভাবে চাঁদা আদায়কারী, ৮. গণক, যে গণনা করে ভবিষ্যতবাণী বলে থাকে, ৯. যাদু ও বান-টোনাকারী, ১০. গায়ক-গায়িকা ও বাদ্য বাজনাকারী। (ইবনে মাজাহ : ১৪৫৩)
শবেবরাতের পূর্ণ রাত্রি জেগে ইবাদত করতে না পারলে, সাধ্যমতো ইবাদত-বন্দেগি করে ঘুমানো যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ফজরের নামাজ যেন কাজা না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আর সম্ভব হলে নিম্নে বর্ণিত আমলগুলো করা যেতে পারে। ১. শবেবরাতে বেশি বেশি ইবাদত করা, ২. নিজের গোনাহর ক্ষমা প্রার্থনা করা, ৩. কবরস্থানে জিয়ারত করা, ৪. ১৫ শাবান রোজা রাখা।


সুতরাং,শবেবরাত হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই, আমাদেরকে হাদিসে বর্ণিত আমলগুলোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে শবেবরাতের ফজিলত অর্জন করার জন্য চেষ্টা করতে হবে।

লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট ও গ্রন্থকার

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?