দীর্ঘদিন যাবৎ ফটিকছড়ি উপজেলা বিভাজন করে ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’ গঠনের প্রশাসনিক উদ্যোগ লক্ষিত হয়ে আসছে। তুলনামূলক আয়তনে বড় হওয়ায় এই উপজেলায় সুষম উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত দীর্ঘদিন ধরে। দুর্গম ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উত্তর অঞ্চলে উন্নয়ন দূরে থাক, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদধূলি পাওয়াও একরকম সৌভাগ্য বলেই মনে করে এইসব এলাকার জনগণ। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও অভিযোগের ভিত্তিতে সরকার ফটিকছড়ি উপজেলা বিভাজনের সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রথম দিকে পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠন প্রক্রিয়া এগুলেও পরবর্তীতে কোন এক অজ্ঞাত কারণে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে এর সাথে নাজিরহাট পৌরসভার দুটি ওয়ার্ডকে যুক্ত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়। আবার প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানের চেয়ে অখণ্ড ফটিকছড়ি উপজেলা সদর নিকটবর্তী হওয়ায় হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের জনগণ প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সাথে না থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এক পর্যায়ে তাঁরা আন্দোলনও শুরু করেন। যার অন্যতম উদ্যোক্তা হলেন বরেণ্য প্রাণিবিজ্ঞানী ও বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া। ফলে প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সদর দপ্তর কোথায় হবে- তা নির্ধারণ করার প্রচেষ্টায় নতুন ভাবনা যুক্ত হয়। ইতোমধ্যে হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন বাদে বাকি চার ইউনিয়নে সরকারি উদ্যোগে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান উপজেলাকে বিভাজন করে প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা গঠন এবং সদর দপ্তরের স্থান নিয়ে গণশুনানিতে জনসাধারণের উত্থাপিত মতামতের আলোকে মাঠ প্রশাসন ২০২৩ সালের ১১ মে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়, যা যথাযথ ছিলো বলা যায়।
সম্প্রতি অজ্ঞাত কারণে ভৌগোলিক দূরত্ব ও প্রশাসনিক জটিলতা বিবেচনা না করে প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা সদর অন্যায্য স্থানে স্থাপনের একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই এলাকার মানুষের সেবা সহজীকরণ এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে নতুন প্রশাসনিক বিন্যাস হিসেবে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের বিষয়টি গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর প্রি-নিকার সভায় অনুমোদিত হয়। যেখানে সদর দপ্তর হিসেবে প্রস্তাবিত স্থানটি বর্তমান সদরের দূরত্ব মাত্র ৭ কিলোমিটার, যা অযাচিত, অপরিকল্পিত ও অযৌক্তিক। অন্যদিকে, উত্তর ফটিকছড়ির বাগানবাজারের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে কেবল এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের আশা ও স্বপ্নভঙ্গই হবে না, বরং একটি অমানবিক ও গনবিরোধী কাজ হবে। ফলে যাঁরাই এই অপচেষ্টার সাথে যুক্ত হবেন, তাঁদেরকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে- এটা নিশ্চিত।
একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে- ফটিকছড়ি উপজেলা প্রতিষ্ঠার (১৯১৮) এক শতাব্দীর বেশি সময় পরে নতুন আরেকটি উপজেলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ বিশাল জনপদ আর বিরাট জনগোষ্ঠীর এই উপজেলার লাখ লাখ মানুষ যুগের পর যুগ বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন। যার ফলে স্বাধীনতার পর থেকে উত্তরের তিন ইউনিয়নবাসীর প্রাণের দাবি হয়ে ওঠে উপজেলা বিভাজন। কোন কারণে অন্যায্য স্থানে উপজেলা সদর দপ্তর স্থাপন করলে উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হবেন। উত্তরাঞ্চলের জনগণের জন্য সরকারি সেবা সহজলভ্য হওয়ার বদলে তা বঞ্চনার নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করবে বলে মনে করি। অপ্রত্যাশিতভাবে এমন কোনো স্থানে উপজেলা সদর দপ্তর হলে তা স্পষ্টতই সরকারের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব সরওয়ার আলমগীর মহোদয়ের সুদৃষ্টি কামনা করি।
লেখক : কলেজ শিক্ষক, মুক্ত সাংবাদিক ও যুগ্ম আহবায়ক, উত্তর ফটিকছড়ি নাগরিক ফোরাম।



