‘শরবত পানি দানোৎসব’ লেখা স্টলগুলোতে চৈত্রের গরমে তৃষ্ণার্ত পুণ্যার্থী ও দর্শণার্থীর ভিড়। ঐতিহ্যবাহী বর্ণিল পোশাক পরিহিত মারমা তরুণ-তরুণীরা এসব তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে তুলে দেন ঠান্ডা পানির শরবত। আবার মাইকে আহ্বান জানিয়ে দুপুরের নিরামিষ ভোজনে আপ্যায়ন করা হয় মেলায় আগত সব জাতি-ধর্মের মানুষকে। একসঙ্গে মিলেমিশে চলে কেনাকাটা, আনন্দ উপভোগ। এমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবসেবার অন্যান্য দৃষ্টান্ত হয়েছে মানিকছড়ির মংরাজ পরিবারের ১৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মহামুনি মেলা।
প্রতি বছরের মতো এবারও পহেলা বৈশাখ মঙ্গলবার মানিকছড়ি মহামুনি বৌদ্ধবিহার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় প্রায় ১৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ মেলা। মংরাজ পরিবার মেলার আয়োজক। মংরাজ বাড়ি সংলগ্ন মানিকছড়ি খালের কূলঘেঁষে টিলারচূড়ায় প্রাচীন মহামুনি বিহারের অবস্থান। শতবর্ষী বটবৃক্ষ, পাকুড়গাছ, কাঠগোলাপ, বাঁশঝাড়সহ বিভিন্ন গাছগাছালি ঘেরা বিহারের চারপাশে রয়েছে মংরাজা নিপ্রু সাইন বাহাদুর, রানি নিহার দেবীসহ রাজপরিবারের মৃতদের উদ্দেশে তৈরি মঠ। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মারমা সম্প্রদায়ের কাছে মহামুনি বৌদ্ধবিহার পবিত্র তীর্থস্থান। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার প্রভৃতি স্থান থেকে এখানে পুণ্যলাভের আশায় আসেন পুণ্যার্থীরা।
প্রায় ১৫০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখ চৈত্রসংক্রান্তির এদিনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাশাপাশি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন ও বাঙালিদের অংশগ্রহণে মিলনমেলায় পরিণত হয় মহামুনি মেলা। প্রায় দুই একর আয়তনের বিহার জুড়ে বসে এ মেলা।
মারমা পুণ্যার্থীরা নতুন বছরের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা আর প্রয়াত স্বজনদের আত্মার সদগতির জন্য কল্পতরুতে অর্থদান এবং বিহারবেদিতে প্রদীপ প্রজ্বলন করেছেন। অন্যরা ব্যস্ত হরেকরকম পণ্য কেনাকাটা আর ঘোরাঘুরিতে। পাহাড়ি-বাঙালি, হিন্দু- মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব বয়সের হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে মেলা প্রান্তরে রচিত হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন ।

সরজমিন দেখা গেছে, বৌদ্ধবিহারে আসা কেউ ব্যস্ত প্রার্থনায়, আরাধনায়। কেউ ঘোরাঘুরি, কেনাকাটায়। মেলায় মৌসুমি ফলফলাদি, হাতপাখা, মাদুর, বাঁশ, কাঠ, মাটি, সিলভার, পিতল-কাঁসার তৈরি বিভিন্নসামগ্রী, আমের ভর্তা, গরম জিলাপি, খাজা-গজা-নাডুসহ লোভনীয় মিষ্টান্ন, কাপড়- চোপড়, খেলনাপাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্রের পসরা বসে। শিশু-কিশোরদের জন্য বসে নাগরদোলাসহ আনন্দ উপভোগের বিভিন্ন রাইড। পুণ্যার্থী ও দর্শণার্থী সবার মধ্যে দেখা গেছে অন্যরকম উচ্ছ্বাস-আনন্দ। মঙ্গলবার ভোরবেলা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমনই মুখরিত ছিল মেলা প্রান্তর।
বান্দরবন থেকে আসা শেফালি মারমা বলেন, ‘আমি অনেক বছর ধরে এদিন মহামুনি বিহারে আসি। এবারও পরিবার নিয়ে এসেছি। নিজের ও স্বজনদের পুণ্যলাভের জন্য প্রার্থনা করেছি। মেলা থেকে অনেক কিছু কিনেছি।’ চট্টগ্রামের নুরুল কবির বলেন, ‘এখানে পাহাড়ি-বাঙালি নানা জাতি-ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে সম্প্রীতির যে বন্ধন রচিত হয়েছে, তা আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।’
মেলা ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি ও সাবেক ইউপি মেম্বার লারে অং মারমা বলেন, এ বছর মেলায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছে। প্রায় ৩০ মণ চালের ভাত, ডাল ও সবজি রান্না করে পুণ্যার্থী ও দর্শণার্থীদের খাওয়ানো হয়েছে। বিভিন্ন এলাকার তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতিরা তাদের নিজস্ব উদ্যোগে স্থাপন করা প্রায় ২০টি স্টলে মেলায় আগত তৃষ্ণার্ত মানুষকে ঠান্ডা পানি, লেবু ও তরমুজের শরবত পান করিয়েছে।
মংরাজ পরিবারের সদস্য কুমার সুইচিং প্রু বলেন, মহামুনি মেলা ধর্মীয় আবেগ ও রাজপরিবারের শত বছরের ঐতিহ্যের নিদর্শন । তিনি জানান, ১৮৮৩ সালে তৎকালীন মংরাজা নিদ্রু সাইন বাহাদুর (পঞ্চম) বিশ্বশান্তি রাজমহামুনি বৌদ্ধ চৈত্য নামে রাজবাড়ির অদূরে মানিকছড়ি ছড়ার পাড়ে এই বিহারটি নির্মাণ করেন। বিহারের নাম অনুসারে ঐ এলাকাটির নাম হয় মহামুনি। বিহারটি নির্মাণের পর থেকে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে বিহারে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঘিরে মেলা বসে ।




