২৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফটিকছড়ির ক্ষণজন্মা এক মহাপুরুষ এস এম শফিউল আজম

মোহাম্মদ শওকত আজম ফারুকী

এস এম শফিউল আজম। ১৯২৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী, মার্জিত ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন ছিলেন। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ছিল জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক শিক্ষায় পরিপূর্ণ। এই পরিবেশই তাঁকে পরবর্তীতে একজন দক্ষ প্রশাসক ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সেই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষটির বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার বাবুনগর গ্রামে। তাঁর নামানুসারে এলাকার নামকরণ হয়েছে আজম ক্লাব নামে। যেখানে সাড়ে তিন দশক ধরে তিনি চির নিদ্রায় শায়িত।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি অসাধারণ মেধা, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং বিশ্লেষণী চিন্তার জন্য পরিচিত ছিলেন। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত একজন মেধাবী ছাত্র।

শিক্ষকতা জীবন: শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি ১৯৪৮-১৯৪৯ সালে ঢাকা কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর পাঠদানের ধরন ছিল সহজবোধ্য, গভীর ও মার্জিত। তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই একজন জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

সিভিল সার্ভিসে যোগদান: পরে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রিয় সুপিরিয়র সার্ভিস (সিএসএস) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। সে সময় বাঙালিদের জন্য উচ্চ প্রশাসনে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু নিজের মেধা, সততা ও প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে তিনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হন।

পাকিস্তান আমলে কর্মজীবন ও প্রশাসনিক উত্থান: ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে তিনি পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জেলা প্রশাসন, কেন্দ্রীয় প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, সময়ানুবর্তিতা ও সৎ নেতৃত্ব তাঁকে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।

পূর্ব-পাকিস্তানের প্রথম বাঙালি চীপ সেক্রেটারি: ১৯৬৯ সালে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের তৎকালীন সরকারের চীপ সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ। এর আগে এই পদে সাধারণত পশ্চিম পাকিস্তানের কর্মকর্তারাই নিয়োগ পেতেন। একজন বাঙালি হিসেবে তাঁর এই পদে নিয়োগ ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি বাঙালি জাতির প্রশাসনিক সক্ষমতা ও মেধার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। চীপ সেক্রেটারি হিসেবে তিনি প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সরকারি কাজের গতি বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, প্রশাসনে বাঙালিদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ ও মুক্তিযুদ্ধের সময়: ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অভিজ্ঞ প্রশাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই সময় পাকিস্তানের প্রশাসনিক সংকট এবং পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। স্বাধীনতার পর নবগঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্র তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়।

স্বাধীন বাংলাদেশে কর্মজীবন: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কেবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে থেকে তিনি- প্রশাসনিক পুনর্গঠন, মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

পরিকল্পনা কমিশনে ভূমিকা: তিনি বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নে তাঁর মতামত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতো।

রাজনৈতিক ও মন্ত্রিত্ব জীবন: পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি-শিল্পমন্ত্রী, যোগাযোগমন্ত্রী, পাটমন্ত্রী, খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে নিষ্টার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ে শিল্পোন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।

কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা: তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর ইংরেজি ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা, মার্জিত ব্যক্তিত্ব ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিদেশি কূটনীতিকদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছিল।

ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য: এস এম শফিউল আজম ছিলেন অত্যন্ত সৎ, নীতিবান, শৃঙ্খলাবদ্ধ, দূরদর্শী, মার্জিত ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ। তিনি সরকারি কাজে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে একজন ভদ্র ও মার্জিত ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করতেন। প্রশাসনে তাঁর অবদান ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাঙালিদের প্রশাসনিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, দক্ষ আমলাতন্ত্র গঠন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তবধর্মী চিন্তা প্রয়োগ, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।

জীবনাবসান: এই কীর্তিমান মানুষটি ৪ ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবনের প্রয়োজনে তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক, রাষ্ট্রনায়ক ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্বকে হারায়। অবসান ঘটে কীর্তিমান মানুষটির দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনের।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এস এম শফিউল আজম এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন মেধা, সততা ও প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতীক। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বাঙালি চীপ সেক্রেটারি হওয়া থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি গঠনে তাঁর অবদান তাঁকে ইতিহাসে স্থায়ী আসন এনে দিয়েছে। আজও তিনি বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস ও প্রশাসনের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।

লেখক: সিনিয়র সহকারী শিক্ষক, গুলতাজ মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?