প্রথম বছরেই মিলবে ফল

ফটিকছড়ি উত্তরে দেশের প্রথম ‘মিয়াওয়াকি পুষ্টি ও আয়বন’

নিজস্ব প্রতিবেদক

অল্প জায়গায় দ্রুত বন সৃষ্টি করে একই সঙ্গে মানুষের পুষ্টি ও আয়ের চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উত্তরে। উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের ঢালারমুখ এলাকায় দেশের প্রথম ‘মিয়াওয়াকি পুষ্টি ও আয়বন’ তৈরির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে সাজেদা ফাউন্ডেশন।

সোমবার (৩১ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েক দিন আগে প্রকল্প এলাকায় ফলজ গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। প্রায় চার শতক জায়গায় তিন-চার ফুট ব্যবধানে ৩২ প্রজাতির মোট ১৫৬টি ফলজ গাছ লাগানো হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের আশা, পরিকল্পিত পরিচর্যা ও মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বেড়ে ওঠা এসব গাছের কয়েকটি প্রজাতি থেকে প্রথম বছরেই ফল পাওয়া যাবে। বাগানে কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, আনারস, পেঁপে, হরিতকি, বহেরাসহ বিভিন্ন ফলজ গাছ রয়েছে। অল্প জায়গায় ঘনভাবে গাছ লাগিয়ে পরিবারের ফলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফল বিক্রি করে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করাই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের অনেক বাড়ির আঙিনা ও ছোট ছোট জায়গা অনাবাদি পড়ে থাকে। এসব জায়গাকে কাজে লাগিয়ে কম পরিসরে কীভাবে ফল উৎপাদন করা যায়, সেই চিন্তা থেকেই ‘মিয়াওয়াকি পুষ্টি ও আয়বন’ তৈরির ধারণা নেওয়া হয়েছে।

মিয়াওয়াকি বন কী

জাপানের প্রখ্যাত উদ্ভিদবিদ আকিরা মিয়াওয়াকি এ পদ্ধতির প্রবক্তা। মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে ছোট জায়গায় ঘনভাবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে তুলনামূলক কম সময়ে প্রাকৃতিক বনের আদল তৈরি করা হয়। এ পদ্ধতিতে গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং একটি এলাকায় কয়েক দশকের মধ্যে ঘন বনভূমি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিয়াওয়াকি পদ্ধতি ব্যবহার করে ছোট পরিসরে বন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন স্থানে এ পদ্ধতিতে বন সৃষ্টির উদ্যোগ রয়েছে। তবে ফটিকছড়ির প্রকল্পটির বিশেষত্ব হলো—এখানে বনজ গাছের পরিবর্তে মূলত ফলজ প্রজাতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সাজেদা ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার ও প্রকল্পটির ‘মিয়াওয়াকি পুষ্টি ও আয়বন’ তৈরির পরামর্শক মুহাম্মদ ইকরাম আল মুবাশ্বির বলেন, ‘প্রথমে মাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। জৈব সার হিসেবে গাছের গুঁড়ি, খড় ও লতাপাতার পচা অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। আলাদা জায়গায় মাটি প্রস্তুত করে তা নির্দিষ্ট স্থানে বিছানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রায় চার শতক জায়গায় ৩-৪ ফুট ব্যবধানে ৩২ প্রজাতির ১৫৬টি ফলজ গাছ লাগানো হয়েছে। কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, পেয়ারা, হরিতকিসহ বিভিন্ন ফলজ প্রজাতির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।’

ইকরাম আল মুবাশ্বির বলেন, ‘এ মিয়াওয়াকি পুষ্টি ও আয়বন তৈরির চেষ্টা সফল হলে আগামী বছর থেকে নিজেদের অর্থায়নে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের মিয়াওয়াকি বন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

প্রকল্পটির উদ্যোক্তা জাফরুল হাসান ইকবাল বলেন, ‘দাঁতমারা এলাকার জায়গাটি আগে পরিত্যক্ত ছিল। আমি জায়গাটির সন্ধান সাজেদা ফাউন্ডেশনকে দিই। ফলজ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য জায়গাটি উপযুক্ত মনে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘জায়গাটি আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে হওয়ায় প্রকৃতিপ্রেমীদেরও আকৃষ্ট করবে। প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করে মানুষ যাতে এখানে সময় কাটাতে পারে, সে জন্য সংরক্ষিত পর্যটনের ব্যবস্থাও করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

জাফরুল হাসান ইকবাল আরও বলেন, ‘প্রকল্পে বৈচিত্র্য আনতে বিভিন্ন ফলজ গাছ লাগানো হয়েছে। শিক্ষার্থী, গবেষক ও প্রাণ-প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের এ উদ্যোগ দেখার সুযোগ থাকবে। আমরা চাই, ছোট জায়গায় পুষ্টি ও আয়বন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক।’

জেলা বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সেলিম বলেন, ‘অল্প সময়ে বন সৃষ্টির একটি দারুণ পদ্ধতি মিয়াওয়াকি পুষ্টি ও আয়বন। বাড়ির ছোট জায়গা কিংবা বাসার ছাদে ফলজ চাহিদা মেটাতে এ মডেলটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’

তিনি বলেন, ‘ফটিকছড়িতে শুধু ফলজ গাছ দিয়ে তৈরি করা এ বন সফল হলে নিজেদের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি উৎপাদিত ফল বিক্রিও করা সম্ভব। সরকারি অনাবাদি ও ন্যাড়া পাহাড়গুলোতে আগ্রহী ব্যক্তিদের অংশীজন করে ‘মিয়াওয়াকি পুষ্টি ও আয়বন’ তৈরির উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।’

উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, ফটিকছড়ির এ পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সফল হলে অল্প জায়গায় ফল উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের বাড়তি আয়ের একটি নতুন মডেল হিসেবে এটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?