ফটিকছড়ির পাহাড়ি জনপদে শিক্ষায়-কর্মে এগোচ্ছেন তরুণীরা

এস এম আক্কাছ

সকালে ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন প্রমি চাকমা। ফিরবেন সেই রাতে, আটটা কিংবা সাড়ে আটটায়। এর মাঝের দীর্ঘ সময়ে তাঁকে সামলাতে হয় দুটি জীবন: একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি, আর নাজিরহাট ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির পড়াশোনা।

২০ বছরের প্রমির কণ্ঠে ক্লান্তির চেয়ে দৃঢ়তাই বেশি। বললেন, ‘সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে বের হই, ফিরতে রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা বেজে যায়।’ কর্মক্ষেত্রের কথা জানতে চাইলে জানালেন, এখন আর তেমন কোনো সমস্যা হয় না। শুরুর দিকে কেবল ভাষা বুঝতে কিছুটা অসুবিধা হতো। সেটুকুও এখন পেছনে ফেলে এসেছেন তিনি।

প্রমি একা নন। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি, খিরাম, কাঞ্চননগর, সুয়াবিলসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ও চা-বাগানে বসবাস করা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনেক তরুণী এখন এভাবেই প্রতিদিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাচ্ছেন বিদ্যালয় ও কলেজে। কেউ পড়ার ফাঁকে চাকরি করছেন, কেউ উচ্চশিক্ষা শেষ করে পা রেখেছেন কর্মজীবনে। নিজেদের স্বপ্ন গড়ার পাশাপাশি তাঁরা হয়ে উঠছেন পরিবারের আর্থিক ভরসাও।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত ফটিকছড়িতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা ১২ হাজার ৮৭৭ জন। এর মধ্যে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ৮ হাজার ৯৯১ জন, চাকমা ১ হাজার ৩১৩ জন এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ২ হাজার ৫৭৩ জন। উপজেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.০১ শতাংশ এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এই সংখ্যা এখন আগের চেয়ে বেড়েছে। আর গত দুই দশকে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ বেড়েছে চোখে পড়ার মতো।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এসব তরুণী এখন শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নন। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, বিদ্যালয় ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তাঁরা।

পাহাড় থেকে শহরে, এক পরিবারের বদলে যাওয়া যেভাবে

এমনই একজন তরুণী কাজ করেন ব্র্যাকে। স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন তিনি। তাঁর পরিবারের একজন সরকারি চাকরি করেন, আরেক বোন পড়ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। একসময় পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করা পরিবারটি এখন ফটিকছড়ি সদরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। একটি পরিবারের এই যাত্রা যেন গোটা জনগোষ্ঠীর বদলে যাওয়ার এক ছোট্ট প্রতিচ্ছবি।

তবু এই অগ্রযাত্রার ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক নীরব দূরত্ব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই তরুণী বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না, তবে অনেকেই আমাদের নিজেদের মানুষের মতো করে মিশতে চান না।’

দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখছেন ফটিকছড়ি উপজেলা প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবদুস সাত্তার। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। গত দুই দশকে প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন।’

ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রব বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা এখন মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছে।’

তবে এই স্বপ্নের পথ যেন নিজের শিকড় ভুলে যাওয়ার পথ না হয়ে ওঠে, সে বিষয়েও সতর্ক করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি এসব জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষাতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

কাল ভোরেও হয়তো সাতটায় দরজা খুলে বেরিয়ে পড়বেন প্রমি। পাহাড়ি পথ আগের মতোই উঁচু-নিচু থাকবে। কিন্তু সেই পথ ধরে এখন যাঁরা হাঁটছেন, তাঁদের গন্তব্য আর শুধু বাড়ির উঠোন নয়, অনেক দূরের এক আলোকিত ভবিষ্যৎ।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?