মানুষ আছে কিন্তু মানুষের মুখ নাই অর্থাৎ মুখে বুলি নাই। দুনিয়ার এমন চিত্র কল্পনার পথেও বাধাপ্রাপ্ত হই। মানুষের মন আছে, মনের কথা আছে। যা প্রকাশিত হয় মুখগহ্বর দ্বারা। তাইতো বলা হয়ে থাকে “মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম,ভাষা।” ড. পবিত্র সরকার বলেন, “পৃথিবীর সমস্ত ভাষা একটা ভাষা থেকেই।” তবে পৃথিবীর সমস্ত ভাষাই মানুষের মাধ্যমে কোনো না কোনো অঞ্চল থেকে জন্মলাভ করে। ইন্টারনেটের তথ্য মতে পৃথিবীতে প্রায় ৭ হাজার ১০০টিরও বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। চাটগাঁ ভাষা, যা বাঙলাদেশের চট্টগ্রামের মানুষের ভাষা, বিশ্বের সর্বাধিক কথিত ভাষাগুলোর মধ্যে ৮৮তম স্থানে রয়েছে। এই ভাষায় প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ কথা বলে থাকেন।
এবার আসি চাটগাঁইয়া কবিতার বিষয়ে, চাটগাঁইয়া কবিতার পরিসরও দিনদিন ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। চাটগাঁ ভাষার প্রকাশনার ক্ষেত্রে যে ক’জন কবির অবদান অনস্বীকার্য তাঁদের মধ্যে চট্টগ্রাম ফটিকছড়ির স্বনামধন্য কবি আফছার উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী অন্যতম। তিনি সিলেটে থাকাকালে চট্টগ্রাম রাউজানের কৃতি সন্তান কিংবদন্তি কবি সুকুমার বড়ুয়ার সাথে দেখা হয়েছিলো। কবি সুকুমার বড়ুয়া কবি আফছার উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরীকে চাটগাঁ ভাষায় কিছু লিখেছেন কি না জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি না বলায় কবি সুকুমার বড়ুয়া বললেন, আপনি চাটগাঁ ভাষায় কলম ধরেন। এরপর থেকে কবি আফছার চাটগাঁ ভাষায় লেখা আরম্ভ করেছিলেন।
চাটগাঁ ভাষায় তাঁর লেখা বই দুটি, “এক বৈউমুত দুই ডইল্লে আচার’ এবং ‘এক বৈউমুত তিন ডইল্লে আচার’। একটা কথা বলে রাখি, ছড়া সব কবিতাও তবে সব কবিতা ছড়া নয়। যারা ছড়াকার তারা একইসাথে কবিও। কবির ‘ এক বৈউমুত দুই ডইল্লে আচার’ গ্রন্থে রয়েছে কবিতা ও গান। তিনশ’র কাছাকাছি রয়েছে ‘দিস্তান’। দিস্তান হলো প্রবাদ-প্রবচন। একটা ভাষার জন্য প্রবাদ-প্রবচন অসামান্য তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘এক বৈউমুত তিন ডইল্লে আচার’ গ্রন্থে রয়েছে কবিতা, গান ও পুথি। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কবি আফছার উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী একাধারে কবি, ছড়াকার, গল্পকার, সম্পাদক, গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী।
তাঁর লেখা (প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত) বইগুলো হলো, ব্যথার পারাবার, দুষ্টু বুদ্ধির পরিণাম, হযবরল, ইসলামিক জাগরণ, মজার গল্প বারমজা, আফছার গীতিমালা-১, আফছার গীতিমালা-২, ছড়ায় ছড়ায় বর্ণমালা-১, ছড়ায় ছন্দে জীবনস্মৃতি, ছড়ায় ছড়ায় বর্ণমালা-২, উপহার, আম্মু আমার ঘুমে, চাটগাঁইয়া গান-মন পঅলার ধন, হিয়ের বাঁধন বিয়ের ছড়া, চাটগাঁইয়া পড়া, ভোটের গান, এক বৈউমুত দুই ডইল্লে আচার, এক বৈউমুত তিন ডইল্লে আচার ইত্যাদি। তিনি চাটগাঁ ভাষার জন্য রেখেছেন অনন্য সাধারণ অবদান। সাহিত্যের নানাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বাঙলাদেশের স্থানীয় ও জাতীয় অনরক পত্রিকা প্রকাশ করেছে তাঁর অসংখ্য লেখা।
শারীরিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি নিরলস নির্বিকার যুদ্ধ করেই চলেছেন। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে তিনি উপভোগ করছেন নিদারুণভাবে। আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলেন নিরন্তর। এখন তিনি সবসময় হাসি মুখেই বলেন, জীবনের কাছে আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। মহাকালের যাত্রাপথের অপেক্ষায় আমি।
লেখক: শিক্ষক ও ছড়াকার।



