হঠাৎ বন্ধু সূজাউদ্দীন জাফর তার বাহনকে রাস্তার পশ্চিম পাশে প্রবেশের নির্দেশনা দিল। পথ অচেনা। একজন দরদী পথচারী বললেন, একটু সামনে গিয়ে বাঁয়ে যেতে হবে। তিনি অতঃপর বাহনে চেপে পথ দেখালেন। বাঁয়ে পাহাড়ি পথ একটু উঁচুতে উঠে সরু পথে চললো। পথ চলতি বাঁয়ের সরু মেঠো পথ নজরে পড়ে না। কিন্তু বাহন একটু যাওয়ার পর দেখা গেলো মনোরম পুকুর, দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, কবরস্থান এবং পুরনো একটা বাড়ির সামনে খড়ের স্তুপ। বাহন থেকে নেমে দেখা গেলো কয়েক জন শিশু খেলছে। তারপর একটা ঝোপঝাড় ; ঝোপঝাড়ের ভেতর কয়েকটি জীর্ণ দেওয়াল।হিসাবে তিন কক্ষ অনুমান করা যায়, ঝোপের আড়াল তাদের অস্তিত্ব, শেওলা জড়ানো, ফাঁকফোকরে আকাশ দেখা যায়। তবে সূর্যালোক তেমন প্রবেশ করে না। সকালের ঝকঝকে সূর্যালোক আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছে কিন্তু এই বৃক্ষের ঝোপে একটু শীতল ছায়া। সঙ্গী পথচারী বললেন, এটাই ফাঁসিঘর।
প্রায় তিনশত বছর আগে গৌড় থেকে একটা ভাগ্যান্বেষী পরিবার, কাজী পরিবার নামে এখানে জমিদারী করতে আসে। এই জমিদারী হলো ফটিকছড়ির ভুজপুর থানায়। এখানে তাঁরা মিয়াবাড়ি নামে পরিচিত হলেও তাদের কেউ কাজী থাকায় কাজীবাড়িও বলেন। এদের এক শাখা কুমিল্লার চিউড়া কাজীবাড়িতে আছে। এইসব কথা সেই বাড়ির একজন উত্তরাধিকার ও জাফরের আলোচনায় থাকলেও আমার আগ্রহ হলো, ফাঁসিঘরের দিকে। ফাঁসি একটা ভয়ানক বিষয় ; এই এখানেই ফাঁসি হতো, কাদের ফাঁসি হতো, কীভাবে হতো – এইসব ভাবনা মনে চেপে বসে। প্রশ্ন এখানে যে ফাঁসিঘর তার স্থাপত্য শৈলি মোগল আমলের না কি বৃটিশ আমলের তা জানার উপায় নেই, অনুমানের সুযোগ আছে মাত্র। অনুমান তো আর ইতিহাস নয়, জনশ্রুতি মাত্র। আর জনশ্রুতি হলে তো তার আর লাগাম টানার দরকার নেই। মোঘল আমলে না হলেও ইংরেজরা দিয়েছে। কারণ ইংরেজ আমলে জমিদারের সাথে সখ্যতা ছিল। শাসক ছিল ইংরেজ, শাসন করতো জমিদার। আর তিন শত বছরের মধ্যে গত পঞ্চাশ বছর আগেও এখানে জঙ্গল ছিল। বাঘাকীর্ণ পাহাড়ি এলাকা ছিল। ফাঁসি প্রদানের জন্য এরচেয়ে নির্জন এলাকা আর কোথায় পাওয়া যাবে! সাধারণত বৃটিশ জমিদাররা ভীষণ অত্যাচারী ছিল, বিনাবিচারে মানুষ হত্যা করতো বা বলা চলে খুনখারাবি তাদের শাসনের অঙ্গ ছিল; সেখানে এই বাড়ি কাজী বা বিচারকের বাড়ি। বিচারক তো ফাঁসির রায় দিতেই পারেন। এখানে বাস্তবে কোনো ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল কীনা প্রমাণ নেই কিন্তু বিনা কারণে ফাঁসিঘর নির্মিত হয়েছিল তাও নয়। ফাঁসিঘর আছে, ফাঁসি হয়েছে তা অনুমান করতে তো দোষের কিছু নয়। ফাঁসি – একটা বিচারিক প্রক্রিয়া হলেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য তা গা ছমছম করার মতো। ছবি তুলতে তুলতে মনে ভেসে আসছিল সিনেমা নাটকে দেখা ফাঁসির সব দৃশ্য। আর মন করুণায় ভরে আসছিল হতভাগ্যদের জন্য। যদিও একজন উত্তরাধিকার বলছেন, তারা ফাঁসির কোনো কাহিনি জানেন না। জানবেন কোত্থেকে, তখনতো তাদের বাপদেরও জন্ম হয়নি।
ফাঁসিঘর এখনো জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়ে আছে। ভেঙেছে কিন্তু মাটিতে মিশিয়ে দেয়নি। এতে আমাদের একটা ভাগ্য হলো ফাঁসিঘর দেখার। এখন মনে হয়, উত্তরাধিকারগণ দূর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে কেউ এটাকে ভেঙে নতুন বাড়ি করেনি। সব শরীক শহরে বন্দরে। যারা আছেন তাঁরা এই ফাঁসি ঘর এড়িয়ে বাড়ি করেছেন। সব পুরনো বাড়ি, মাটির ঘর বন্ধ পড়ে আছে। এইসব গল্প করতে করতে, ছবি তুলতে তুলতে গল্প এগিয়ে চলে।
এইসব জমিদার বাড়ি নিয়ে কয়েকটি লোমহর্ষক ঘটনা না থাকলে অনেকটা যেনো ইজ্জত থাকে না। গল্পকার বলে চললো, এই বংশের কেউ কেউ নিমাই বড়ি বানাতেন। এই নিমাই বড়ির অনেক গুণ। যৌবন ধরে রাখা, বাতব্যথা মুক্ত থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি।
নিমাই বড়ি বানাতে প্রয়োজন ছিল অন্ডকোষ প্রাণী। তা আবার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। একদিন এই বাড়ির কেউ কেউ দেখলো, এক গরীব মা সাহায্যের জন্য এসেছে পুত্র সন্তান সহ। নজর করে তারা আবিস্কার করলো পুত্র এক অন্ডকোষী। তারা মায়ের কাছ থেকে পুত্রকে দত্তক নেওয়ার ছল করে তাকে রেখে দেয়। পুত্রকে ভালোমন্দ খাবার দিয়ে একটা উপযুক্ত সময়ে ফুটন্ত কড়াইয়ে ফেলে দেয়। কয়েক দিন সিদ্ধ হওয়ার পর তলানীতে তার ফুটন্ত জলীয় অবশেষকে শুকিয়ে নিমাই বড়ি বানালো। এক গা হিম করা প্রক্রিয়ায় মানবসন্তান বড়লোকের জীবনদায়ি বা যৌবন বা বাতব্যথার বড়ি হয়ে গেলো। হয়ে গেলো, নিমাই বড়ি।
ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। মা জানতে পেরেছিল হতভাগ্য সন্তানের করুণ ও নির্মম পরিণতি। তিনি এসে অভিশাপ দিয়েছিলেন পরিবারটাকে। অভিশাপ অনন্ত হয় যেনো। অভিশপ্ত পরিবার অভিশাপের চিহ্ন বহন করে। মায়ের আর্তনাদ না হয় কোথায় যাবে!
আমার ফাঁসিঘর পরিদর্শন লোককথায় বিষাদে পরিণত হলো। ইতিহাস ও লোককথা বা লোকশ্রুতি খুব করুণ, বিভৎস ও নির্মম হয়। মানুষের মনকে বিষাদে ভরিয়ে দেয়।
এর কথক সূজাউদ্দীন জাফর। আমি শ্রোতা। তবে, হ্যাঁ, এসবকে লোকশ্রুতি হিসেবে দেখা ভালো, ইতিহাস নয়। আমাদের ভ্রমণের পরতে পরতে এইরকম ইতিহাস ও জনশ্রুতি এসে ভর করে!
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক



