দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের মাথায় বাংলাদেশের জনগণের জন্য আবার পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ভারত সরকারের পক্ষে । গত বৃহস্পতিবার ২৫ জুন, ভারতের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, আগামী ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভারতে আসার জন্য পর্যটন ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে । এছাড়া মানবিক বিবেচনায় মেডিকেল ভিসারও গতি বাড়ানো হবে । আপাতত ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা–এই পাঁচটি সেন্টার থেকে ভিসা প্রদানের কাজ শুরু হবে । ২০২৪ এর ৫ আগস্ট বাংলাদেশে উদ্ভূত গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই পর্যটন ভিসার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । সেসময় ভারতবিদ্বেষপ্রসূত মনোভাব নিয়ে সেদেশে অবস্থিত ভিসা অফিসগুলোতে উচ্ছৃঙ্খলতা ও ভাঙচুরও চালানো হয়েছিল ।
এর আগে এদিন দুপুর বারোটা নাগাদ ঢাকার বঙ্গভবনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের হাতে তাঁর পরিচয় পত্র পেশ করে নবনিযুক্ত হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তাঁর দায়িত্ব শুরু করেন । এই পদক্ষেপ ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ইতিবাচক মাত্রা যোগ করবে বলে কূটনৈতিক মহলের বিশ্বাস ।
সম্প্রতি ভারতের বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়েছে । তাঁর এই গুরুদায়িত্ব প্রাপ্তির কারণ তিনি শুধু গুজরাটের অধিবাসী এবং এদেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুই নন । তিনি দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গে থেকে রাজনীতি করেছেন । ব্যারাকপুরে প্রতিনিধিত্ব করেছেন । পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন এবং লোকসভার প্রাক্তন সদস্য ছিলেন । ২০১৬-১৭ বর্ষে তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ সংসদ হিসেবে ও সম্মানিত হয়েছেন । তিনি ভালো বাংলা জানেন । বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর ধারণা রয়েছে তাঁর । রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের অনুরাগী তিনি । সর্বোপরি বাঙালিদের ভাষা ও সংস্কৃতির সংবেদনশীলতার দিকটিও তিনি বুঝেন । পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারণে এবং সীমান্ত সমস্যাগুলো সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল থাকায় ভারত সরকার পেশাদার কূটনীতিবিদ নিয়োগের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে । তিনি পূর্বতন রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ।
অন্যদিকে গত ২৪ জন বুধবার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কেবিনেট মন্ত্রীর (পূর্ণ মন্ত্রীর) সমতুল্য মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে তাঁকে সরকারি প্রটোকল তালিকা বা ‘টেবিল অব প্রেসিডেন্সি’ এ পূর্ণমন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে । এই নির্দেশিকা মূলত রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান এবং প্রটোকল সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে ।
আন্তরাষ্ট্রীয় কূটনীতির ক্ষেত্রে এটি একটি বিরল ঘটনা । এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত সিদ্ধার্থশংকর রায় ১৯৯২-৯৬ সময়কালে আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় পূর্ণ মন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা পেয়েছিলেন । নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের জন্য এই পদপ্রাপ্তি কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর ঢাল হিসেবে কাজ করবে । পূর্বতন রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মার মতো তাঁকে যখন খুশি, যতবার খুশি, ডেকে জবাবদিহি চাইতে পারবে না বাংলাদেশ সরকার । তিনি নিশ্চিন্ত মনে দু দেশের জন্য গঠনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবেন । ভারত সরকার চাইছেন, পারস্পরিক সমস্যাগুলো বোঝাপড়ার মাধ্যমে এবং একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ না ছড়িয়ে সমাধানের প্রয়াস নিতে । সর্বোপরি উপমহাদেশে উত্তেজনা প্রশমিত রাখার লক্ষ্যেই পূর্ণমন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা দিয়েই একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রদূত করা হয়েছে । তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু করার ঘোষণায় । ধাপে ধাপে এরকম আরও বহু বিষয়ে সমাধান হয়তো সম্ভব হবে । সামনেই গঙ্গা ও তিস্তার জল বন্টনসহ যৌথ নদী কমিশনের নানা বিষয়ে সুরাহা হয়ে যাবে । ঠান্ডা মাথায় ডায়ালগ জারি রাখলে মেঘ না চাইতে জলের মতো যেমন ভিসা প্রক্রিয়া চালু হচ্ছে তেমনি অনেক সুবিধা ভারত একতরফাভাবে ঘোষণা করে দেবে ।
গত ১২ জন ২০২৬ পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের অবস্থা সম্পর্কে বলেন, ভারত ও বাংলার ‘একই আকাশ একই বাতাস একই যন্ত্রণা’ । অবশ্য এতে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল জামাত ইসলাম তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে । তারা তার বাস্তব আবেগের দিকটি অনুধাবন করতেই পারেনি । শুধুমাত্র ভারত-বিদ্বেষের অন্ধবিশ্বাস থেকেই হইচই শুরু করে দেয় । নবনিযুক্ত হাই কমিশনার যে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে কথাটি বলেছেন,যা তিনি পরবর্তী বাক্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি বলেছেন, ‘/আমার তো মনে হচ্ছে না আমি বাংলাদেশে এসেছি । ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি কোটি জনগণের জন্য যা ভালো হয় সেটাই করা হবে ।’ পর্যটন ভিসা প্রদান প্রক্রিয়া শুরু করা তারই প্রতিফলন এবং সেদেশের বিরোধীদের সামলানোর প্রথম পদক্ষেপ এটি । কূটনৈতিক মহলেরও পর্যালোচনা, দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্নবায়ন ও নিবিড় করার ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবেন । আখেরে দুই দেশের জনগণই লাভবান হবেন । ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ও বাস্তবায়নের সহায়ক হবে । ত্রিপুরার ক্ষেত্রে সাব্রুমের ফেনী নদীর উপর নির্মিত মৈত্রীসেতু ঘিরে পর্যটন ও বাণিজ্যের যে সম্ভাবনা থমকে আছে তারও হয়তো অচিরেই জট খুলে যাবে । সাব্রুম শহরকে ১’৮৪ কিউসেক ফেনীনদীর জল উত্তোলনের থেমে থাকা সিদ্ধান্তটিও বাস্তবায়িত হবে । নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নতুন দিগন্তরেখার দিকে দু’দেশের জনগণই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে ।
লেখক : শিক্ষক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, ত্রিপুরা, ভারত



